Friday, 26 February 2016

ছুটি

    অনেকদিন থেকেই সুন্দরবনে প্রদীপদার বাড়ি যাব ভাবছি । কিন্তু শুধু ভাবনাতেই থেকে গেছে । প্রায় তিন বছর হয়ে গেল প্রদীপদা আমাদের স্কুল থেকে মিউচুয়াল ট্রান্সফার নিয়ে বাড়ির কাছে চলে গেছে । এখন যোগাযোগ বলতে শুধুই ফোন । যখন একসাথে ছিলাম তখনকার কথা মাঝে মাঝে ভাবি , আর অবাক হই এই মানুষটি শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিজেদের পৈত্রিক ব্যবসা ছেড়ে এত দূরে পড়ে আছে । যেখানে আপাতভাবে নিজের বলতে কেউ নেই । যাই হোক , শুক্রবার ছুটি আছে , আবার সোমবারও ছুটি । তাই শণিবার স্কুল না গেলে চারদিনের একটা ছোট ট্রিপ হয়ে যাবে ।

      হয়তো এই গরমের মধ্যে সুন্দরবন খুব ভালো লাগবে না , কিন্তু অনেকদিন পর প্রদীপদার সাথে দেখা হবে । প্রদীপদার বাবা মানে জেঠুর সাথে দেখা হবে । মনে হয় খুব খারাপ লাগবে না । এইসব ভাবতে ভাবতে প্রদীপদাকে ফোন করে বসলাম । উল্টোদিকে প্রদীপদার গলাটা কেমন যেন ধরা ধরা লাগল । জিজ্ঞাসা করতে জানালো , ও কিছু না , এমনিই একটু ঠান্ডা লেগেছে । গরমের জন্য কদিন রাতে স্নান করা হয়েছিল । আমার যাবার কথা শুনে প্রদীপদা বারে বারে বলে দিল , আমি বাড়ি থেকে বেরোতে যেন দেরি না করি । একে তো অনেকখানি পথ , তার উপর কদিন বিকেল হলেই আকাশ কালো করে আসছে কালবৈশাখী । যাই হোক , প্রদীপদা জানিয়েই দিল গোসাবায় ওদের গাড়ি থাকবে । ও হয়তো থাকতে পারবে না , তবে অনেকদিনের পুরানো ড্রাইভার রঘুদা থাকবে , কোনো অসুবিধা হবে না । আর রঘুদার ফোন নম্বরটাও আমায় দিয়ে দিল ।

     যাই হোক সকাল সকাল বেরোবো ভাবলেই তো আর হয় না , বাড়ি থেকে কোথাও বেরোতে গেলে কপালেও থাকা চাই । তো শুক্রবার সকলেই একটা কাজ এসে পড়ায় তা মিটিয়ে বেরোতে বেরোতে এগারোটা বেজে গেল । একটা ট্যাক্সি ধরে শিয়ালদা পৌঁছে ক্যানিং - এর টিকিট কেটে ট্রেনে চেপে বসলাম । ট্রেনে খুব ভিড় থাকলেও জানালার ধারে একটা সিট পেয়ে বসে আনন্দই হচ্ছিল । এতখানি রাস্তা যেতে হবে তাই বসতে পেয়ে ভালো লাগছিল ।

     ট্রেন ছাড়ল বারোটা পাঁচ এ । কিছুক্ষণ পরই বুঝতে পারলাম এই ট্রেনে ভিড়ের জন্য বসে থাকা আর না থাকার মধ্যে কোনো তফাতই নেই । সেই ভিড়ের মধ্যেই আবার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হকার তাদের কাছে কি আছে তা বলে চলেছে । ট্রেনও চলছে তার নিজের মত করে । পাল্লা দিয়ে গরমও বেড়ে চলেছে ।

     চলতে চলতে প্রায় আড়াইটের দিকে ক্যানিং এ পৌঁছালাম । স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাসস্ট্যাণ্ডে পৌঁছালাম । কিন্তু বাসন্তীর বাস ছাড়তে এখনও প্রায় আধ ঘন্টা বাকি । এই দুপুরের গরমে কিছুই যেন ভালো লাগছে না । কি করি , পাশে একটা চা - এর দোকান দেখে বসে পড়লাম । অনেক রিকোয়েস্টের পর চা - এর অর্ডার নিল । সঙ্গে ডিমভাজা বলতেই হল ।

     তিনটে দশ এ বাস ছাড়ল । বাসে যাত্রী বলতে আমাকে নিয়ে সাতজন । বাকি ছয়জনের মধ্যে তিনজন সব্জী বিক্রি করে বাড়ি ফিরছে । বাসও চলেছে খুবই আস্তে । প্রায় সব জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ছে । কিন্তু যে বলবো তারও উপায় নেই ।

      বাসে বসে থাকতে থাকতেই দেখি আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে । আর প্রায় চারটের দিকে চারিদিক অন্ধকার করে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল । এই রকম বৃষ্টি , আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে ঝড় । এইরকম প্রাকৃতিক তাণ্ডবের মধ্যে আবার ড্রাইভার একটা স্টপেজে বাসটিকে দাঁড় করিয়ে দিল দেখলাম একমাত্র আমি ছাড়া আর কারোর কোনো তাড়া নেই যেন । যখন কোনো কিছুতেই লাভ হয় না , তখন আমিও তাদের সাথেই প্রকৃতির তাণ্ডবলীলা উপভোগ করতে লাগলাম । কারণ অবশ্যই গরমের হাসফাসানি কমে যাওয়া ।

     যখন ঝড় বৃষ্টি কমে এল , প্রায় পাঁচটার দিকে আবার বাস ছাড়ল । দেখলাম কিছু প্যাসেঞ্জার বেড়েছে । তাদের নিজেদের মধ্যে নানা রকমের কথা শুনতে শুনতে চলেছি । কখনও জানালা দিয়ে বাইরের চারপাশ দেখি । আর কৃত্রিমতার ছোঁয়া যে চারদিক ছেয়ে ফেলেছে , তা দেখি । ছয়টার দিকে যখন বাসন্তীতে পৌঁছালাম , তখন কে বলবে আজ দুপুরে বাসের জন্য এক মিনিট দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছিলো ।

     পাশে একটা দোকান দেখে , টিফিন করার সিদ্ধান্ত নিলাম । যা ভাবা তাই কাজ । কিন্তু দোকানটায় যা শুনলাম তাতে আমার চোখ কপালে ওঠা ছাড়া আর কোনো গতি নেই । বাসন্তী থেকে মাজিদবারি যাওয়ার শেষ বাস বেরিয়ে গেছে প্রায় পাঁচটার দিকে । কি আর করা যায় । শেষে অনেক চেষ্টার পর ঐ দোকানদারই একটা লরিতে তুলে দিল । যাই হোক দোকানদারটিকে অনেক অনেক ধন্যবাদ দিয়ে লরিতে উঠে বসলাম । লরিতে কিছু মাল নিয়ে এসেছিল । এখন খালি ফিরছে ।

     লরিতে বসে যাচ্ছি তো যাচ্ছি । এই সময় আবারও বৃষ্টি শুরু হল । আজ নিশ্চয়ই ঘুম থেকে উঠে আয়নায় চোখ পড়েছিল । ভাবলাম প্রদীপদাকে ফোন করে জানিয়ে দিই , আমি বাসন্তী পৌঁছে গেছি । ফোনও বের করলাম । কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয় , এই বৃষ্টিবাদলার মধ্যে কখন যে নেটওয়ার্ক বসে গেছে বুঝতে পারিনি । আর কি করি ! এবার যেন একটু চিন্তা হতে শুরু করল । প্রদীপদা একবার বলেছিল মাজিদবারি থেকে গোসাবা পর্যন্ত খেয়া রাত আটটার পর বন্ধ হয়ে যায় । আবার ভাবলাম এখন আর চিন্তা করেই কি হবে ! যা থাকে কপালে । শেষে না হয় লরির ড্রাইভার - খালাসীকে বলে কিছু একটা ব্যবস্থা করে নেব ।

হঠাৎই চমক ভাঙল নীচে থেকে ড্রাইভারের ডাকে । বুঝলাম , নানা কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম , আর এর মধ্যেই মাজিদবারি এসে গেছে । লরি থেকে নেমে পড়লাম । পাশেই একটা ধাবা মতন রয়েছে । সেখানেই ড্রাইভার ও খালাসী রাতে থাকবে । ঘড়িতে দেখলাম সবে সারে আটটা বাজে । ড্রাইভারকে আবারও অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে একটা একশো টাকার নোট তার দিকে বাড়াতেই ড্রাইভার দাদা তো নাক কান মুলে কত কি ! সে যে নিতে পারবে না তা বোঝানোর জন্য অনেক কথা বলে গেল । শেষে বলল যদি মাল খাওয়ার জন্য দেন তো নিতে পারি ।

     তাদের বিদায় জানিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খেয়াঘাটে এসে পৌঁছালাম । সেখানে প্রায় কেউ নেই । কয়েকজন শুধু বাংলার বোতল নিয়ে জটলা করছে । তাদের কাছেই এগিয়ে গেলাম । তাদের সাথে কথাবার্তায় বুঝলাম তারা প্রত্যেকেই মাঝি । কিন্তু এতরাতে কেউই গোসাবা যেতে রাজি নয় । তাদের সারে আটটার কথা বলায় , দেখলাম সবাই কেমন মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে । একজন তো বলেই ফেলল , বাবু আমরা মদ খাই , কিন্তু মাতাল নই । ভালো করে ঘড়িটা দেখেন । তো আমি ঘড়িতে আবারও সারে আটটা দেখে বুঝলাম সারে আটটার সময় আমার ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ।

      যাই হোক তাদেরই একজন জানালো যে তখন সারে এগারোটা বাজে । তাদের যখন অনেক করে বললাম , তখন বেশি ভাড়ায় একজন আমাকে খেয়া পারাপারে রাজি হল । কিন্তু যদি অন্য কাউকে পায় তো তাকে তুলে নেবে । আমি তো হাতে স্বর্গ পেলাম । এতরাতে মনে হয় না আমার মতো কেউ আছে বলে । জিজ্ঞাসা করার পর জানলাম মিনিট দশেক লাগবে গোসাবায় যেতে । তবে আজ বৃষ্টি বাদলার দিন তো তাই একটু বেশি লাগতে পারে ।

     কি আর করা যায় ! সঙ্গীদের সাথে আরও কিছুক্ষণ কাটানোর পর মাঝিভাই উঠলেন । কিন্তু এত মদ খেয়েছে যে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না । এই ঝড়বৃষ্টির রাতে মাতাল অবস্থায় থাকা মাঝির সাথে যাব কিনা ভাবছি । না গিয়ে উপায়ই বা কি ? অগত্যা  . . . . .  , আমার অবস্থা বুঝতে পেরে অন্য একজন বলে উঠল , আপনার কোনো ভয় নেই , আসগার ভাইকে কোনো ভাবে তুলে একবার স্টিয়ারিং এ বসিয়ে দিলেই হল । ওর আর কোনো অসুবিধা হবে না । কিন্তু কি হবে আর কি হবে না সে তো আমিই বুঝচি !

      যা থাকে কপালে ! নৌকায় উঠেই পড়লাম । ততক্ষণে ইঞ্জিন লাগানো নৌকা তার আওয়াজ শুরু করে দিয়েছে । যাই হোক মিনিট দশেক মতই লাগলো । গোসাবায় নামলাম । কিন্তু ভাটা থাকার জন্য বোধহয় জেটিতে না লাগিয়ে কাঠের পাটাতন ফেলে আমায় কাদার মধ্যে নামিয়ে দিল । ভাড়া চুকিয়ে কোনো রকমে কাদা থেকে উঠে এলাম । মোবাইল বের করে দেখি এখনও কোনো নেটওয়ার্ক নেই ।

এত রাতে কি আর করি । কোথায় যাব । কোনো দোকানপাটও খোলা দেখছি না । তার উপর আবারও টিপ টিপ করে বৃষ্টি নামল । পকেট হাতরে একটাও সিগারেট পেলাম না । কি করব ভাবছি । হঠাৎ বেশ খানিকটা দূরে একটা আলো দেখতে পেলাম । তো সেদিকে এগিয়ে গেলাম । সেটি একটা পান বিড়ির দোকান । কিন্তু আমার কথা শুনে দোকানদার তো বলেই ফেলল যে , আমি নাকি খুব ভুল কাজ করে ফেলেছি । এখানে থাকার মতো কোনো জায়গাই নেই । এদিকে খুব খিদেও পেয়েছে । যাই হোক ঐ দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট ও বিস্কুট কিনলাম । ভাগ্যচক্রে দোকানদারটি প্রদীপদাকে চেনে । কিন্তু ঐ পর্যন্তই । জানতে পারলাম আর কিলোমিটার পাঁচেক মতো পথ । একটাই রাস্তা , মাঝে এক জায়গায় দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে । আমায় যেতে হবে বামদিকের পথে ।

      এখন প্রায় বারোটা বাজে । ঘন্টা খানেক হাঁটলে হয়তো পৌঁছে যাব । কিন্তু রাতে যদি পথ ভুল করি । তার উপর টিপ টিপ করে বৃষ্টিও পরছে । যদিও আমার জামা কাপড় প্রায় পুরোটাই ভিজে গেছে । এই অবস্থায় কি আর করি ! একটা সিগারেট ধরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম । অন্ধকারে ঠিক বোঝাও যাচ্ছে না । তবে রাস্তার দুপাশে গাছ থাকায় খুব একটা অসুবিধাও হচ্ছে না । ভাবছি এত রাতে এই প্রথমবারের জন্য যখন প্রদীপদার বাড়িতে ঢুকবো , ওদের বাড়ির অন্য সদস্যরা কি ভাববে ?

       হয়তো মিনিট দশেক এসেছি । হঠাৎ পিছন থেকে আলো জ্বেলে একটা গাড়ি আসতে দেখলাম । আমি তো রাস্তার মাঝেই দুই হাত উপরে তুলে তাকে থামার অনুরোধ জানাচ্ছি । কিন্তু গাড়ির গতি কমার কোনো লক্ষণই নেই । এবার রাস্তার মাঝ থেকে সরে যাব ভাবছি , সেই সময়ই মারুতি ভ্যানটা আওয়াজ করে ব্রেক কষে আমার পাশে থামল । অন্ধকারে গাড়ির রংটিও ভালো করে বুঝতে পারলাম না । ড্রাইভারের সিটে একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক , মুখে ছোটো ছোটো খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি । কিন্তু এই গরমের দিনেও একটা মাফলার গলায় জড়ানো । তো সেদিকে আমার তখন লক্ষ্য দেওয়ার সময় নয় । তাকে যখন দুলকি যাবার কথা বললাম , তখন ঐ ড্রাইভার দাদাই জানালো যে তার নাম রঘুবীর হাজরা । প্রদীপদার বাড়ি থেকেই এসেছে আমাকে নিয়ে যাবে বলে । বিকেলের ঝড়ের আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ।

     এই একটু আগেই বাবলুর পান বিড়ির দোকানে জেনেছে আমি হেঁটে যাচ্ছি । তাই আমার পিছনে এসেছে , আমাকে প্রদীপদার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তারপর ছুটি । আমিও আর সময় নষ্ট না করে সামনের সিটে উঠতে গেলে হঠাৎ রঘুদা পিছনের সিটে বসতে বলল । আমিও আর বাক্য না বাড়িয়ে পিছনে গিয়ে উঠলাম ।

      গাড়িতে ওঠার পরই আমার কেমন যেন একটা গন্ধ নাকে এল । রঘুদাকে বলতে জানালো যে একটু নোংরা হয়েছে । আমাকে নামিয়ে দিয়ে পরিষ্কার করে নেবে । কিন্তু গন্ধটা কিসের তা কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না । রঘুদাও গাড়িতে স্টার্ট দিল । পিছনের সিটে বসলেও হেডলাইটের আলোয় তখন বাইরের রাস্তার সব কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম ।

      কিছুক্ষণ চলার পর দেখতে পেলাম সত্যিই রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গেছে । কিন্তু রঘুদা ডানদিকের পথ নিল কেন ? বাবলুর দোকানে তো শুনলাম বাঁদিক দিয়ে গেলে তবে দুলকি । তবে কি রঘুদার ছদ্মবেশে অন্য কেউ আমায় ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে ? মনের মধ্যে উত্তেজনা চেপে না রেখে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম । শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রঘুদা জানালো বিকেলের ঝড়বৃষ্টির আগে হলে বাম দিক দিয়েই যেত । কিন্তু বিকেলের ঝড় আর বৃষ্টিতে ঐ রাস্তায় অনেক গাছ উপড়ে পড়ে আছে । এখনও সব পরিষ্কার হয়নি । তাই প্রায় পনেরো কিমি ঘুরে ডানদিক দিয়ে যেতে হবে ।

কি আর করি ! তবে রঘুদার হাতে যেন জাদু আছে । এই বর্ষা বাদলের রাতে যে ভাবে গাড়ি চালাচ্ছে তাতে বেশিক্ষণ লাগবে বলে মনে হয় না । তারপর থেকে আর কোনো কথাও হয়নি । হঠাৎই দূরে আলোর রেখা জেগে উঠছিল । এইরকমই একটা জায়গায় , হয়তো দৃশ্যমান আলো থেকে বড়জোড় পঞ্চাশ মিটার দূরে রঘুদা গাড়ি থামালো । আর জানালো সামনে যে বাড়িটায় আলো জ্বলছে সেটাই প্রদীপদার বাড়ি । ও আর যাবে না । গাড়িটা একটু পরিষ্কারও করতে হবে । প্রদীপদার বাড়ির সবাই এখনও জেগে আছে ।

      ভাবলাম আমি আসব জানে । একে এতো দেরি হচ্ছে । তার উপর নেটওয়ার্ক বসে যাওয়ার জন্য কোনো খবরও পাচ্ছে না । তাই হয়তো জেগে আছে । দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক । আজ যে কিভাবে শিয়ালদা থেকে প্রদীপদার বাড়িতে পৌঁছেচি , তা শুধু আমিই জানি । আর দেরি না করে ব্যাগটি কাঁধে নিয়ে সবে একটু এগিয়েছি , ভাবলাম রঘুদাকে বলি এতোটা যখন এলে , তো প্রদীপদার বাড়ি থেকেই ঘুরে যাও না । পিছনে ফিরেই . . . . . .

       একি ! এইমাত্র যে গাড়িটা করে আমি এতটা পথ এলাম তা গেল কোথায় ? গাড়ি গেলেও তো আওয়াজ হবে । আমি কোনো আওয়াজ পেলাম বলে তো মনে হলো না । ভাবলাম আজ এতোটাই টায়ার্ড , আর একের পর এক যা ঘটে চলেছে তাতে আর কিছু না ভেবে প্রদীপদার বাড়ির দিকে এগিয়ে যাই ।

        দূর থেকেই দেখতে পেলাম এত রাতেও প্রদীপদা বাড়ির বাইরে রয়েছে । আরও কয়েকজন বয়স্ক ভদ্রলোক । কেমন যেন একটা শোকাচ্ছন্ন ভাব । কিছু যে একটা হয়েছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না । কিন্তু এত রাতে হেঁটে হেঁটে আমাকে আসতে দেখে প্রায় ছুটেই প্রদীপদা আমার কাছে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল , ফোন তুলছিলি না কেন ?

       ফোন তো সেই বিকেল থেকে বন্ধ । কোনো নেটওয়ার্কই নেই । আমিও অনেক বার তোমার সাথে যোগাযোগ করার কথা ভেবেছি , কিন্তু পারিনি । এইসব কথার মাঝেই জ্যেঠিমা এবং বৌদি বাড়ির ভিতরে ডাকল । বাড়ির ভিতরে ঢুকতে ঢুকতেই প্রদীপদা জিজ্ঞেস করল গোসাবা থেকেই হেঁটে আসছি কিনা ? আমি বললাম গোসাবা থেকে হাঁটা শুরু করার পরই রঘুদা গাড়ি নিয়ে আমার কাছে আসে এবং এই একটু আগেই নামিয়ে দিয়ে হঠাৎই কোথায় যেন চলে গেলো । সবাইকে থামিয়ে দিয়ে জেঠু বললেন , আজ আর কোনো কথা নয় । শরীর নিশ্চয়ই খুব টায়ার্ড । আজ যেন খেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে নিই । কাল অনেক কাজ আছে । দেখলাম কেউই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে যে যার মতো আলাদা আলাদা হয়ে গেলো । আমিও একটা ঘরে বিশ্রাম করতে চলে গেলাম ।

      পরদিন সকাল থেকেই কেমন যেন একটা বিষাদের ছায়া দেখলাম । কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না । প্রদীপদাকে জিজ্ঞেস করেও কোনো উত্তর পাইনি । শুধুমাত্র প্রদীপদা একবার আমায় বলল আমি ঠিক রঘুদার সাথেই এসেছিলাম তো !

       দেখো প্রদীপদা , আমি তো রঘুদাকে চিনি না , তবে সে তার নাম রঘুনাথ হাজরা বলেছিল । তার মুখে খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি ছিলো । গলায় মাফলার ছিলো ।

       প্রায় তখন সকাল নটা , হঠাৎ একটা পুলিশের জিপ এসে প্রদীপদাদের বাড়ির সামনে থামল । একজন পুলিশ এগিয়ে এসে বাড়ি থেকে কোনো একজনকে নিয়ে যেতে চাইলো । কি যেন আইডেনটিফাই করতে হবে । আর কি সব ক্রেন , গাড়ি নিয়ে কথা বলছিল । যাই হোক , কি হয়েছে জানার জন্য প্রদীপদার সাথেই পুলিশের জিপে গিয়ে উঠলাম । জিপ সোজা থানায় নিয়ে গেলো । সেখানে প্রদীপদা ও . সি . র সাথে কথা বলা শুরু করল । জানালো তাদের গাড়ির নম্বর , কাগজপত্রও দেখালো । কিন্তু কি হচ্ছে তা এখনও আমার মাথায় ঢুকছে না । ও . সি . জাানালো দু এক দিন পর থানা থেকে গাড়িটি নিয়ে যেতে এবং আমাদের ছেড়ে দিল । দেখলাম যে জিপটি করে আমরা এসেছিলাম তার ঠিক পিছনে একটা সাদা রঙের মারুতি ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে । দেখে বোঝা যায় গাড়িটির উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে । ছাদের খানিকটা অংশ বেঁকে নিচের দিকে ঢুকে গেছে । প্রদীপদা তাড়া দিল , আমিও মারুতি ভ্যানটির পাশ দিয়ে গিয়ে জিপে উঠলাম । মারুতির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটা চেনা গন্ধ নাকে লাগল । কিন্তু কিসের গন্ধ বুঝতে পারলাম না ।

     দুপুরে সবাই যখন একসাথে খেতে বসলাম , তখন আর চুপ করে না থেকে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম , কি হয়েছে ?

     জেঠু বললেন , কাল রঘু ছুটি চেয়েছিল । আমার আসার কথা থাকায় , আমাকে গোসাবা থেকে এনে দিয়ে বাড়ি যাবে কথা ছিলো । সেই মতো বিকেল চারটের দিকে বাড়ি থেকে বের হয় । বৃষ্টি তখন শুরু হয়ে গেছে । জ্যেঠিমা বারন করেছিল । বৃষ্টি থামলে যাবার কথাও বলেছিল । কিন্তু যদি আমাকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় , তাই ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়েই রঘুদা আমাকে নিয়ে আসার জন্য বেরিয়েছিল । মাঝ পথেই প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যে একটা গাছ উপড়ে রঘুদার গাড়ির উপর পড়ে । এখানেই শেষ নয় , ঝড়ের দাপটে গাড়িটি পাল্টি খেয়ে পাশের নোংরা ড্রেনের মধ্যে পড়ে । কোনো কারনে রঘুদার মাথায় চোট পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় । সেই অবস্থায় ড্রেনের মধ্যেই সারে আটটা পর্যন্ত পড়ে ছিলো । সারে আটটার দিকে একজন বাইকে করে যাওয়ার সময় দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয় । পুলিশ এসে লাশ তুলে নিয়ে গেলেও রাতে গাড়ি তুলতে পারেনি । আজ সকালে ক্রেন এনে টেনে গাড়ি তুলে থানায় রেখেছে । পোস্টমর্টেম হয়ে গেলে আজ বিকেলে রঘুদার বডি দিয়ে দেবে ।

       এই পর্যন্ত শোনার পর আমার কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয় , বুঝতে পারছিলাম না । বিকালে প্রদীপদার সাথে যখন মর্গে গেলাম , তখন আমাকে চিনিয়ে দিতে হয়নি , সেই মাফলার গলায় পাকা দাড়ির মানুষটিকে , যে কিনা কাল ছুটি চেয়েছিলো । 

Wednesday, 24 February 2016

কলসী

    স্কুল থেকে ফিরে একটা কাজে একবার সন্ধ্যের সময় আমতায় যেতে হয়েছিল । তো কাজ মিটতে মিটতে বৃষ্টি নামল । ফলে বসে বসে গল্প , সঙ্গে পিঁয়াজ , কাঁচালঙ্কা , ছোলা , শশা সহযোগে মুড়ি । ব্যাপারটা বেশ জমে উঠেছিল । আর বাইরের বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গল্পে ভূত ঢুকতে দেরি করেনি । আবার সেই ছোটবেলায় বাবার কাছে শোনা নানা ভূতের গল্পে জমে উঠছিল । কিন্তু বাধ সাধল বৃষ্টিটা হঠাৎই যেমন এসেছিল তেমন হঠাৎই থেমে গেল । আর আমাকেও অনেকটা রাস্তা ফিরতে হবে তাই উঠে পড়লাম ।
    মাঘের শেষে শীত কমে এলেও বৃষ্টির পর রাতে একটু শীত শীত করছিল । তবে খারাপ লাগছিল না । চারিদিকের বৃষ্টির পরের জ্যোৎস্নার নিস্তব্ধ রূপ দেখতে দেখতে উৎফুল্ল মনে আসছিলাম । কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজে বাইকটার কি হয়েছে জানি না , মাঝ রাস্তাতেই বন্ধ হয়ে গেল । এখনও অনেকটা রাস্তা যেতে হবে । ফাঁকা মাঠের মধ্যে দিয়ে রাস্তা । কোনো দোকানপাটও নেই । কি আর করি ! কয়েকবার স্টার্ট দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করলাম । অগত্যা , মাথা থেকে হেলমেটটি খুলে বাইকটি টেনে নিয়ে চললাম ।
    একটু একটু করে এগোই , আর বিশ্রাম নেওয়ার নামে একটা করে সিগারেট ধরাই । এইভাবে এগোতে এগোতে দেখতে পাচ্ছি ঐ যে দূরে আমাদেরই গ্রামের শ্মশানের পাশ দিয়ে রাস্তা গিয়ে গ্রামে ঢুকেছে । আর তো একটুখানি । তারপরই বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিতে পারবো ।
    এই বিশ্রামের কথা ভাবতে ভাবতেই শ্মশানের পাশে এসে পড়লাম । আঃ ! এ কি দেখছি । চারিদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধুই ঝিঁঝিঁর ডাক । শ্মশানের পাশের পুকুরের জলে শত শত চাঁদ । অপূর্ব শোভা দেখতে দেখতে চমকে উঠলাম । রাস্তার উপর দিয়ে একটা মাটির কলসী এগিয়ে আসছে । একটু এগোয় , তারপরই থেমে যায় । আবার একটু এগিয়ে আসে । হাতের কাছে কোনো আলোও নেই । জ্যোৎস্না আছে , কিন্তু রাস্তার পাশের বড় বড় গাছ ভেদ করে রাস্তায় আলো খুবই কম ।
    তো আমার মন আবারও উৎফুল্ল হয়ে উঠল । যাই হোক , এতদিন পর একটা ভূতের দেখা পেলাম । আমার জীবন আজ স্বার্থক । একথা তাহলে সত্যি । এতদিন না মানলেও আজ নিজের চোখে দেখে অবিশ্বাস করি কিভাবে ? মাটির কলসী শ্মশানে থাকবে , এতে আমি কিছু  অস্বাভাবিক না দেখলেও মাটির কলসী নিজের থেকে এগিয়ে আসে , এটা আগে কখনও কারোর কাছে শুনিনি ।
    কিছুতেই মন মানতে চাইছিল না । যা দেখছি , তা কি ঠিক নয় ? কিন্তু চোখের সামনে এখনও দেখতে পাচ্ছি । আমার কেমন যেন বোধ শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে । কোনটা ঠিক ? মন না চোখ !
     যাই হোক , অহেতুক আর সময় নষ্ট করা যায় না । বাইকটা দাঁড় করিয়ে কলসীর দিকে এগিয়ে গেলাম । ততক্ষণে কলসীটিও রাস্তা থেকে মাঠের দিকে নেমেছে । ঐখানটায় অন্ধকার একটু বেশি । আবারও চমক লাগার পালা ।
    চমকে উঠলাম একটা শিয়ালের ডাকে । আর দেখলাম , রাস্তা থেকে কলসীটি নামার সময় একটা ইটের টুকরোয় ধাক্কা লেগে ভেঙে যাওয়ার ফলে মাথা থেকে কলসীমুক্ত হয়ে শিয়ালটি ডেকে উঠেছে । তারপর সেখান থেকে পালাতে সময় নেয়নি । আর মন না চোখ কোনটি ঠিক বুঝতে আমারও কোনো অসুবিধা হয় নি ।