Tuesday, 8 March 2016

রত্নগুহা , 2

        হোটেলে ফিরে আসার পর থেকে কতকগুলি প্রশ্ন আমার মাথার মধ্যে ঘুরেই চলেছে । যেদিন থেকে ধুন্চে এসেছি , সেদিন থেকেই প্রশ্ন গুলি ঘুরছে । নেপালের এই শৈলশহরের এমন এক অবস্থান যেখান থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আহোরণ করা খুব সহজ । কিন্তু তা সত্ত্বেও এই শহরের খুব বেশি একটা উন্নতি হয়নি । এখন অবশ্য অনেক লোক বেড়াতে আসে । তবে ধুন্চেতে টুরিস্ট থাকে খুব কম । তাই হোটেলের সংখ্যাও কম । তবে খুব একটা অসুবিধা নেই । সামান্য পয়সা দিলেই এখানে গেস্ট হাউসে রাত্রিবাস করা যায় । যাই হোক প্রশ্ন গুলিতে আসা যাক ।

       আমি কোনো জায়গায় দেখিনি যে গাড়িতে এলাম , তাদের বললাম তোমরা এগিয়ে যাও , আমি এখানে একটু ঘুরে হোটেলে ফিরব , এটা বলার সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিয়েছে । হয়তো অনেক জায়গাতেই আমাকে বাদানুবাদে জড়াতে হয়েছে । কিন্তু এখানে একবার বলতেই মেনে নিল । যেন আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো । শুধু আমাকে এখানে নামিয়ে দিয়ে গেল ।

       আর সেই নরম পাথর আর নদী । আর সেই সুতোর মতো অংশ গুলোই বা কি ? হোটেলে ফিরেও খুব একটা উপকার হল না । এটা ওটা ভাবতে ভাবতে ল্যাপটপে আজকের তোলা ছবি গুলো দেখছিলাম । হঠাৎ মনে হল গুহার ভিতরের লেখা গুলো তো চীনা ভাষাও হতে পারে । চীনা হরফের মতো অনেক গুলো হরফ গুহার ভিতরের ছবির মধ্যে পেয়েছি । খুব আফশোস হচ্ছিলো , চীনা ভাষাটা না জানার জন্য । কি আর করা যায় ! ভাবতে ভাবতে ছবিগুলো দেখতে দেখতে সবে একটা সিগারেট ধরিয়েছি , হঠাৎ ডোরবেল বেজে উঠলো ।

           উঠে দরজা খুলে দেখি , হোটেলের ম্যানেজার ডাকতে পাঠিয়েছে । কারা যেন আমার বর্ণনা দিয়ে আমাকে খোঁজ করছিল । ইচ্ছা না থাকলেও ল্যাপটপটা বন্ধ করে বিছানায় রেখে নীচে ম্যানেজারের রুমের দিকে রওনা দিলাম । সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই একটা চেনা গলা শুনতে পেলাম । এইরে , এরা তো আমায় আমার সাথে এখন আসবেনা বলল ।

      আমি কলকাতা থেকে রওনা দেওয়ার আগেই শুভঙ্কর আর দীপাঞ্জন কে আসার কথা জানিয়েছিলাম । ওদেরও একসাথে আসার জন্যও বলেছিলাম । তখন না করেছিল । তাই আমি শুধু একার জন্যই সব ব্যবস্থা করে বের হই । শেষ মুহূর্তে তো ভিসায় আটকে যাচ্ছিলাম । শেষে দীপাঞ্জনই তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করে দেয় । কিন্তু কোনো ভাবেই পনেরো দিনের বেশি ভিসা পাইনি ।

       আমি যখন ওদের আমার সাথে নেপালে যাওয়ার কথা বলি তখনই ওরাও ঠিক করে নেপালে এসে আমায় সারপ্রাইস দেবে । আমাকে না জানিয়েই একই সাথে ভিসার জন্যও আবেদন করে । তাদেরও পনেরো দিনের ভিসা মঞ্জুর হয়েছে ।

     তো আমি কলকাতা থেকে ট্রেনে সমস্তিপুর হয়ে মজফ্ফরপুরে এসে নামি । সেখান থেকে ট্রেন চেঞ্জ করে মোতিহারী । এবারে সড়কপথে চাপয়া , সাগাউলি , রামগড়য়া হয়ে রাক্সুয়াল । এখানেই ভারত নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্রামপুর । তারপর সোজা রাস্তা , বীরগঞ্জ , আমলেখগঞ্জ , হেটৌড়া হয়ে কাঠমাণ্ডু । সেখানে রাতে থেকে পরদিন সকালে বেরিয়ে শিবপুরী নাগার্জুন ন্যাশানাল পার্কে ঘুরে সন্ধ্যার দিকে ধুন্চে । আগে থেকেই হোটেল ঠিক করা থাকায় কোনো অসুবিধা হয়নি ।

      গতকাল সন্ধ্যায় যখন এই হোটেলটায় উঠলাম , তখনও মনে হচ্ছিলো শুভঙ্কর ও দীপাঞ্জন এলেই বোধ হয় ভালো হতো । আর এখন এই হোটেলেই তাদের দুজনকে দেখে যে কি আনন্দ হচ্ছিলো তা বলার মতো নয় ।

       এখানে আমাদের পরিচয় গুলো একটু দিয়ে রাখি । আমি মানে বিট্টু সাহা , একটা কলেজে জুলজি পড়াই । শুভঙ্করের নিজের একটা স্টুডিও আছে । আর বাকি সময় ভ্রমণ নিয়েই পড়ে থাকে । দীপাঞ্জন জিওলজি নিয়ে পাশ করার পর ONGC তে কর্মরত । তবে আমাদেরই মতো সেও ভ্রমণ পাগোল ।

          নীচে ম্যানেজারের সঙ্গে কথাবার্তার পর ওদের রুমে নিয়ে এলাম । আমার পাশের রুমটিও আমাদের দিলেও রাতে আমরা একসাথে একই রুমে থাকবো ঠিক করলাম । রুমে ঢোকার পর ওদের ফ্রেশ হয়ে নিতে বললাম এবং আজ সকাল থেকে কি কি হয়েছে তা ওদের জানালাম । ল্যাপটপে ছবিগুলিও দেখাচ্ছিলাম । ছবিগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎই শুভঙ্কর গুহার ভিতরের দেওয়ালের একটা ছবিকে দেখতে বলে । আমিও অনেকক্ষণ ধরে ছবিটা দেখার পরও আলাদা ভাবে কিছু বুঝতে না পেরে ওকে এটা দেখার কারণ জিজ্ঞাসা করি । শুভঙ্কর জানায় দেখ মানুষ গুলির যে ছবি পাশে রয়েছে তার তুলনায় পোকা গুলির আকার যেন অনেক বড় বড় ।

          আমিও হলপ করে বলতে পারি এইরকম এতবড়ো গুবরে পোকার কথা আগে কখনও শুনিনি । এখন যদি লেখা গুলি পড়তে পারতাম । তিনজনে এই নিয়েই আলোচনা হচ্ছিলো । হঠাৎ দীপাঞ্জন বলল , আচ্ছা ম্যানেজার বাবুকে জিজ্ঞাসা করলে হয় না ? যদি এখানে চীনা ভাষায় দক্ষ কেউ থেকে থাকে । যা ভাবা তাই কাজ । আবারও ছুটলাম ম্যানেজার বাবুর কাছে । আমাদের কথা শুনে তিনি জানালেন যে , তিনি একটু আধটু চীনা ভাষা জানেন । তিনি আমাদের হেল্প করতে সম্মত হলেন ।

          তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে রুমে এলাম । ছবি গুলি তিনি অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন । লেখা গুলিও দেখলেন । তিনি দেখছিলেন আর মাঝে মাঝেই তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ছিল । কিন্তু তিনি কোনো কথা বলছিলেন না । অনেকক্ষণ আমাদের অপেক্ষায় রাখার পর তিনি জানালেন যে পুরোপুরি এই লেখার অর্থ তিনি বুঝতে পারেননি । তবে যেটুকু বুঝতে পেরেছেন তা অতি ভয়ংকর ।

       এখানে একটা গোবরে পোকার কথা বলা হয়েছে । যা হান বংশের রাজা মিজান এর আমলের । রাজা মিজানের রাজত্বকালে দক্ষিণ প্রদেশে হঠাৎই এই ধরনের গোবরে পোকার সংখ্যা বেড়ে যায় । এই পোকাগুলি আকারে এতটাই বড় ছিলো যে তারা মানুষকে আর ভয় পেত না । শুধু তাই নয় , এক সময়ে পোকাগুলি মানুষকেও আক্রমণ করা শুরু করে । সমস্ত ফসলের বারোটা বাজিয়ে দেয় । শেষে দক্ষিণ প্রদেশ থেকে লোকজন ভয়ে পালাতে শুরু করে ।

       এই পর্যন্তই তিনি উদ্ধার করতে পেরেছেন । আর তাতেই বিপত্তি গেলো বেড়ে । কি সেই পোকা ? এটা তো তাহলে মানুষের কাছে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নথি । কিন্তু এরপর কি করে জানব বাকিটা কি ? হাতে প্রায় দিন দশেক সময় আছে । কিন্তু এই কাজের জন্য দশ দিন যথেষ্ট নয় । যাই হোক , ঠিক করে ফেলি , এই দশ দিনে যতটুকু এগোনো যায় এগোই। বাকিটা পরের বার এসে হবে । ম্যানেজারবাবুকে আমাদের ভাবনার কথা জানালে উনিই ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্টেটকে বলে সব ব্যবস্থা করে দেবে বলে জানালেন ।

       পরদিন শুধু এদিক ওদিক ঘুরেই কেটে গেল । সব কাগজপত্র জোগাড় করতে আবারও একবার কাঠমাণ্ডু যেতে হল । ঠিক হল আমি , শুভঙ্কর , দীপাঞ্জন , ম্যানেজারবাবু ও আরও আটজন স্থানীয় আদিবাসী একসাথে পরদিন সকাল ছয়টার সময় রওনা দেব । আমাদের সাথে প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছু উপকরণ নিয়ে নিলাম । বারোদিন চলতে পারে এরকম শুকনো খাবার নিয়ে নিলাম । দড়ি , গাঁইতি বন্দুক , তাঁবু , প্রায় সব কিছুর ব্যবস্থাই ম্যানেজারবাবু করে দিলেন ।

        সকালে যখন বেরোতে যাচ্ছি তখন ম্যানেজারবাবু একটা চিঠি আমাদের দিলেন । রাতেই কাঠমাণ্ডু থেকে পাঠিয়েছে । তাতে লেখা রয়েছে , আমাদের ট্রেকিং এর পারমিশন দিলেও যেহেতু আমরা ভারতীয় এবং এই ট্রেকিং এর সঙ্গে চীন এর সম্পর্ক জড়িত এবং তা পুরোপুরি অজানা ভূগর্ভস্থ পথে । তাই আমাদের রক্ষা করার সাথে সাথে যাতে কোনো গণ্ডগোল না হয় , আমাদের সাথে দুই জন নেপালী আর্মি অফিসার যাবেন । এতে আমাদের যে অসুবিধা হবে , তার জন্য নেপাল সরকার ক্ষমাপ্রার্থী ।

       চিঠিটা পড়ে আমাদের তো আনন্দই হল । একে তো বিদেশ বিভুঁয়ে বহু বছরের পুরানো লেখাকে বিশ্বাস করে এগিয়ে যাওয়া । তার উপর আবার ভূগর্ভস্থ পথে । শুরু করার কতদিন পরে যে আবার সূর্যালোক দেখতে পাব তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই । কিন্তু অফিসারদ্বয়ের দেখা তো মেলে না । আমরা প্রত্যেকেই রেডি হয়ে চুপচাপ বসে আছি । যাই হোক সারে সাতটার দিকে একটি পুলিশের গাড়ি হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ালো । দেখলাম তা থেকে তিনজন নামলেন ।

          আমাদের দিকে এগিয়ে এসে পরিচয় দিলেন । তাদের মধ্যে দুজন আর্মি অফিসার ও একজন বিদেশ মন্ত্রকের লোক । বিশেষ প্রয়োজনে আমাদের ভিসার মেয়াদ আরও পনেরো দিন বাড়ানো হয়েছে । তা আমাদের জানাতে ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র আমাদের দিতে এসেছে ।

       সত্যি কথা বলতে কি , আমার যে তখন কি আনন্দ হচ্ছিলো তা বলার নয় । আর্মি অফিসার দুজনে দেখলাম ভালোই হিন্দি জানে । ফলে আমাদেরও সুবিধা হচ্ছিলো । ঠিক হল নটার দিকে আমরা যাত্রা শুরু করব ।

        হোটেলেই প্রত্যেকে টিফিন করে নিলাম । ঠিক হয় গুহার মুখে গিয়ে আবার থামা হবে । গত পরসু দিন আমি একা যে পথে গুহায় পৌঁছেছিলাম , সেই পথেই আমরা আস্তে আস্তে এগোতে থাকলাম । দেখলাম আগের তুলনায় এবারে সময় যেন একটু বেশি লাগল । বারোটার দিকে আমরা সবাই গুহার মুখে পৌঁছালাম ।

         প্রতিবারের মতো এবারও শুভঙ্কর সঙ্গে থাকায় ওকেই টিম লিডার করা হয় । ওকে সাহায্য করার জন্য আমরা প্রত্যেকেই তো রইলাম । তা শুভঙ্কর জানালো এখানে একঘণ্টা রেস্ট নেওয়ার পর আমরা গুহায় প্রবেশ করবো । যদিও গুহার ভিতরে উঁকি মারা প্রায় সবারই হয়ে গেছে । আধঘণ্টা পরেই দেখি সবাই সেই বড়ো পাথরটার সামনে জড়ো হয়েছে । আসলে সামনে কি আছে তা জানার জন্য প্রত্যেকেই এতোটা উদগ্রীব যে , কারোরই যেন তর সইছে না ।

       আজ অনেক গুলি টর্চের আলো পড়ায় দেখলাম পাথরটার উপরে ডানদিকের কোনে যে খাঁজটা দেখেছিলাম , একটু চেষ্টা করলে সেখান দিয়ে একজন মানুষ গলে যেতে পারে । কিন্তু খাঁজটা উপরের দিকে হওয়ায় একটু অসুবিধা হতে পারে । তাই গাঁইতি ব্যবহার করে পাথরের ডানপাশটায় একটা মানুষের যাওয়ার মতো পথ করে নিতে হয় । সামনের পাথরটাকে ভেঙে পথ বের করতে বেশ খানিকক্ষণ সময় লেগে গেল । 

        শেষে যখন আলো পাথরের পিছনে গিয়ে পড়লো , তখন দেখলাম গুহাটা চওড়ায় কোথাও কুড়ি ফুট , তো কোথাও পঞ্চাশ ফুট । কিন্তু উচ্চতায় প্রায় সব জায়গাই ফুট কুড়ি মতো । তবে এখানেও উপরের ছাদ থেকে পাথরের ফলার মতো অংশ ঝুলে রয়েছে । আর দুপাশের দেওয়াল অদ্ভুত রকমের মসৃণ । 

Monday, 7 March 2016

রত্ন গুহা , 1

        এই একটি নেশার জন্য আবারও বিট্টুকে বিপদে পড়তে হচ্ছিল । না না , তেমন কিছু নয় , ছবি তোলার নেশাই বিট্টুকে বারবার বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণে উৎসাহিত করে । তো একবার হয়েছে কি , নেপালে বেড়াতে গিয়ে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে একটা পাহাড়ী গুহা দেখে আর লোভ সামলাতে পারেনি । ফলে দলছুট হতে সময় লাগেনি । যাদের সাথে এসেছিল তাদের বলে দিল সন্ধ্যায় হোটেলে দেখা হবে ।

       কিন্তু এই পাহাড়ী পথে একেবারে একা । তার উপর কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই নতুন উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া । সম্বল বলতে কাঁধের বিশেষ ব্যাগ , যেটা বিট্টুর সঙ্গে সবসময়ই থাকে । একটা আধভর্তি জলের বোতল , ক্যামেরা , মোবাইল । দেখে তো মনে হয় কিলোমিটার দুয়েক হবে । কিন্তু মাঝে যে খাদ রয়েছে । এইদিকের পাহাড় থেকে নেমে খাদের উল্টোদিকের পাহাড়ে উঠতে হবে । কতোটা নামতে হবে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না । কিন্তু ঘড়িতে সবে আটটা বাজে । প্রায় সারা দিনটাই পড়ে আছে । যদি ঘন্টা চারেকে ঐ দিকটা ঘুরে আসা যায় তো মনে হয় না খুব একটা অসুবিধা হবে ।

      যাই হোক নতুন উদ্দ্যোমে শুরু করা । প্রথমে কোন পথ ধরা হবে মোটামুটি একটা ঠিক করে নিয়ে দূরের কিছু একটাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে যাওয়া । এগিয়ে যাওয়া না বলে এখানে নীচে নামা বলাই ভালো । নামার সময় খুব একটা যে অসুবিধা হচ্ছে তাও না । শুধু একটু সতর্ক থাকা । পায়ের তলার পাথর খুব একটা আলগা নয় । আর পাথরের ফাঁকে ফাঁকে প্রচুর ঝোপঝাড় থাকায় আরও সুবিধা হচ্ছে । নামতে নামতে বিট্টু যে কতগুলি ছবি তুলল তা বলে বোঝানো যাবে না । বলা ভালো বিট্টু নীচে না নেমে ছবি তুলতেই ব্যস্ত ।

       প্রায় আধঘণ্টা পরে ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে বিট্টু আস্তে আস্তে ক্যামেরাটাকে ব্যাগে ঢোকালো । জলের বোতল থেকে ঠিক একঢক জল মুখে নিল । কিন্তু ঘিটলো না । সামনের অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য শুধু খালি চোখে কিছুক্ষণ উপভোগ করল । আর তারপরই প্রায় তিরিশ ফুট খাড়াই পাহাড় থেকে নামার উপায় খুঁজতে লাগল । তবে খুব বেশিক্ষণ খুঁজতে হল না । নীচ থেকে অনেক গাছ খাড়া হয়ে উঠে গেছে । তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটা আবার হাতের নাগালের মধ্যেই আছে । নীচে প্রায় পঞ্চাশ ফুট মতো সমতল ভূমি । তার পাশ দিয়ে একটা নদী বয়ে চলেছে । খুবই সরু নদী । কিন্তু তার স্রোত খুব । যাই হোক হাতের কয়েকটা জায়গায় ছড়ে যাওয়ার বিনিময়ে বিট্টু গাছ বেয়ে নীচে নেমেও এসেছে ।

       সমতল ভূমিতে পা দেওয়া মাত্রই বিট্টু কেমন যেন একটা নরম নরম ভাব অনুভব করছে । কোথাও বালির উপর একটা শতরঞ্জি পেতে দিলে যেরকম হয় অনেকটা তেমনই । কিন্তু এই শক্ত পাথুরে জমির মাঝে এইরকম নরম ভাব বিট্টুকে কেমন যেন মোহমুগ্ধ করে ফেলল। আর বিট্টুও পা ছড়িয়ে নীচে বসে পড়ল । আর বসেই ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করল ।

        খানিকক্ষণ বসার পর উঠে পড়ল । কারণ গুহাটির কাছে পৌঁছাতে গেলে এখনও অনেকটা উপরে উঠতে হবে । তবে এই দিক থেকে দেখে ওঠাটি খুব কঠিন হবে বলে মনে হচ্ছে না । মাঝে শুধু একটি খরস্রোতা । তবে নদীর জলের ফাঁকে ফাঁকে অনেক পাথর আছে দেখা যাচ্ছে । নদীর জল কাচের মতো স্বচ্ছ । আর গভীরতাও বেশি নয় । তবে আগের অভিজ্ঞতা থেকে বিট্টু জানে এইরকম নদীতে হঠাৎ নেমে পড়লে কি হতে পারে । তাই এখন বিট্টু খুব সতর্ক । আগে চারদিকটা ভালো করে দেখে নেয় । ঐ তো , একটু এগিয়ে গেলেই বেশ কয়েকটা পাথর নদীর মাঝ থেকে মাথা উঁচু করে জেগে রয়েছে ।

       পাথরগুলোর দিকে এগিয়ে যায় বিট্টু । এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছে কিছুটা দূরে তিনটি পাথর জল থেকে মাথা তুলে আছে । আর একটু এগিয়ে গেলেই নদীটা একটা পাথরের আড়ালে চলে গেছে । নদীর পাশ দিয়ে হাঁটার সময় একটা আলাদা রকমের সুন্দর অনুভুতি জাগে বিট্টুর মনে । শুধু নদীর কলকল শব্দ । যা এই পাহাড়ী নিস্তব্ধতাকে সজীবতায় পরিনত করেছে । কিন্তু পায়ের নীচের নরম পাথর বিট্টুর মনে এখনও প্রশ্ন রেখে দিয়ে যায় ।

       নীচের পাথরটার কিছু নমুনা নেওয়ার জন্য ঝুঁকে পড়ে । পায়ের নীচে অদ্ভুত রকমের একপ্রকার কালচে সবুজ রঙের বালি । আর বালিগুলি যেন অদৃশ্য এক টানে একে অপরকে আঁকড়ে রয়েছে । প্রচুর রোয়ার মতো খুব লম্বা লম্বা সুতো যেন একসাথে আটকে রয়েছে । প্রকৃতির কি অদ্ভুত বিস্ময় । কিছুটা সুতোর মতো অংশ ও কিছুটা বালি একটা খালি কৌটোর মধ্যে নিয়ে ব্যাগে রাখে বিট্টু । না ! নিজের চোখের প্রশংসা করতেই হয় বিট্টুকে । যার জন্য এই ঠান্ডা নদীর জলে একটুও পা না ঠেকিয়ে লাফিয়ে লাফিয়েই নদী পেরোতে পারলো ।

       নদী পেরিয়ে যাওয়ার পরও আবার বিস্ময় । যে পাথর তিনটের উপর দিয়ে লাফিয়ে বিট্টু নদী পেরোলো , সেই পাথরগুলি কেমন যেন আলগা মতো । শেষের পাথরটা তো এতটাই নড়ে উঠল যে বিট্টু প্রায় জলের মধ্যে পড়েই যাচ্ছিল । কোনোমতে সামলে নিয়েছে । এবারে উপরে ওঠার পালা । ওঠার আগে একবার ঘড়ি দেখে নেয় বিট্টু । সবে নটা পাঁচ ।

       আস্তে আস্তে উপরে উঠতে থাকে । মাঝে মাঝেই থেমে হাত ও পা কে বিশ্রাম দিয়ে নেওয়া । আর বিশ্রাম নেওয়ার সময় অপর দিকের সৌন্দর্য চোখ ভরে দেখা । তবে এই সৌন্দর্যের একটা আলাদা মাদকতা আছে । যা বিট্টুকে কখনও টায়ার্ড হতে দেয় না । তারপর আবার উপরে ওঠা । মাঝে একবারই শুধু একটা নীলচে বেগুনী রঙের ফুল দেখে ক্যামেরা বের করতে হয়েছিল ।

       ঘড়িতে তখন দশটা বেজে পনেরো । আর ফুট কুড়ি সামনেই একটা প্রাকৃতিক গুহা । একটু জিড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করছিল । গুহার সামনে বসে নীচের নদী আর সামনের পাহাড়ের অপূর্ব সৌন্দর্য দেখে চোখের পাতাও ফেলতে ইচ্ছে করছিল না । ব্যাগটা খুলে জলের বোতল বের করে বিট্টু । একটা বিস্কুটের প্যাকেট কেটে কয়েকটা বিস্কুটও খেয়ে নেয় । ব্যাগ থেকে টর্চটা বের করে আনে । একটা ছোট পাথর গুহার মুখ থেকে ভিতরের দিকে ছুঁড়ে দেয় । গুহার ভিতরের অন্ধকারে পাথরটির পড়ার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায় ।

     না এবারে তাড়াতাড়ি গুহার ভিতরটা ঘুরে দেখে নিতে হবে । ডানহাতে টর্চটি জ্বেলে ধরে আস্তে আস্তে গুহার ভিতরে প্রবেশ করে । গুহার মুখটা পনেরো ফুটের মতো হবে । ভিতরে মনে হয় একটু বেশিই হবে । উপরের ছাদ থেকে অনেক শক্ত পাথরের ফলার মতো অংশ নীচের দিকে ঝুলে রয়েছে । চারদিক দেখতে দেখতে ভিতরের দিকে ঢুকতে থাকি । মনে হয় খুব সামান্য ঢালু হয়ে গুহাটি ভিতরের দিকে চলেছে । সামনেই একটা বড় পাথর প্রায় সমস্ত অংশ জুড়ে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।

      তবে কি গুহার শেষ এখানেই ? হয় তো হবে । তবুও চারদিকে আলো ফেলে দেখতে থাকি । হঠাৎ দেওয়ালে কিসের যেন নকশা দেখতে পাই । হাঁ , দেওয়ালে আলো পড়তেই বোঝা যায় দেওয়ালের মধ্যে নানা রকমের ছবি ও কি সব হিজিবিজি লেখা রয়েছে । কি এসব ? বুঝতে না পারলেও ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করতে দেরি হয়নি । প্রায় আধঘণ্টা মতো লাগলো পুরোটা ঘুরে দেখতে ।

      আরও কিছুটা সময় এখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিই । আবারও একবার পুরো গুহাটা তন্ন তন্ন করে খোঁজা শুরু করি । কিছু দেখা বাদ যাচ্ছে না তো ? গুহার ভিতরটায় কেমন যেন একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা । শুধু দূর থেকে ভেসে আসা জলের কলকল শব্দ । কিন্তু কি অদ্ভুত । গুহার মুখের কাছে নদীর জলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল না । কিন্তু গুহার ভিতরে একেবারে শেষ প্রান্তে এসে বাইরের নদীর জলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে ।

       তবে কি এখানে কোনো ভূগর্ভস্থ নদী রয়েছে ? কিন্তু গুহাটির শেষ দেখতে পাচ্ছি তো । হয়তো গুহার ভিতরে পাথরের দেওয়ালের বিপরীতে কোনো নদী রয়েছে । আর তার থেকে শব্দ পাথর দ্বারা বাহিত হয়ে এই গুহার মধ্যে এসে পৌঁছাচ্ছে । সব দেখা শেষ করে এবারে গুহা থেকে বেরিয়ে পরব ভাবছি ।

       হঠাৎ গুহার মধ্যে যে পাথরটা পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল তার উপরে ডানদিকের কোনের কাছে একটা ছোট খাঁজ মতো চোখে পড়ল । তবে কি কেউ বা কারা এই বড় পাথরটা দিয়ে গুহাটির পথ আটকে রেখেছে ? কিন্তু কার পক্ষেই বা সম্ভব ? এতবড় একটা পাথরকে সরানো তো আর মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় । আমার কাছে তো পাথর ভাঙার মতো কোনো কিছুও নেই । কিন্তু কেমন যেন মনে হচ্ছে এই পাথরের  পিছনেও কিছু আছে ।

        যাই হোক , আজ আর তো কোনো কিছু সম্ভব নয় । কাল না হয় আর একবার আসা যাবে । আজ বরং ফেরা যাক । অনেকখানি হাঁটতে হবে । নামার সময় তো আর কষ্ট হয় না । কিন্তু ওঠা যে নামার মতো সহজে হয় না । ঠিক যেভাবে যেপথে গুহার মুখ পর্যন্ত এসেছিলাম , সেই পথেই হোটেলের দিকে ফিরে চললাম ।

Friday, 26 February 2016

ছুটি

    অনেকদিন থেকেই সুন্দরবনে প্রদীপদার বাড়ি যাব ভাবছি । কিন্তু শুধু ভাবনাতেই থেকে গেছে । প্রায় তিন বছর হয়ে গেল প্রদীপদা আমাদের স্কুল থেকে মিউচুয়াল ট্রান্সফার নিয়ে বাড়ির কাছে চলে গেছে । এখন যোগাযোগ বলতে শুধুই ফোন । যখন একসাথে ছিলাম তখনকার কথা মাঝে মাঝে ভাবি , আর অবাক হই এই মানুষটি শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিজেদের পৈত্রিক ব্যবসা ছেড়ে এত দূরে পড়ে আছে । যেখানে আপাতভাবে নিজের বলতে কেউ নেই । যাই হোক , শুক্রবার ছুটি আছে , আবার সোমবারও ছুটি । তাই শণিবার স্কুল না গেলে চারদিনের একটা ছোট ট্রিপ হয়ে যাবে ।

      হয়তো এই গরমের মধ্যে সুন্দরবন খুব ভালো লাগবে না , কিন্তু অনেকদিন পর প্রদীপদার সাথে দেখা হবে । প্রদীপদার বাবা মানে জেঠুর সাথে দেখা হবে । মনে হয় খুব খারাপ লাগবে না । এইসব ভাবতে ভাবতে প্রদীপদাকে ফোন করে বসলাম । উল্টোদিকে প্রদীপদার গলাটা কেমন যেন ধরা ধরা লাগল । জিজ্ঞাসা করতে জানালো , ও কিছু না , এমনিই একটু ঠান্ডা লেগেছে । গরমের জন্য কদিন রাতে স্নান করা হয়েছিল । আমার যাবার কথা শুনে প্রদীপদা বারে বারে বলে দিল , আমি বাড়ি থেকে বেরোতে যেন দেরি না করি । একে তো অনেকখানি পথ , তার উপর কদিন বিকেল হলেই আকাশ কালো করে আসছে কালবৈশাখী । যাই হোক , প্রদীপদা জানিয়েই দিল গোসাবায় ওদের গাড়ি থাকবে । ও হয়তো থাকতে পারবে না , তবে অনেকদিনের পুরানো ড্রাইভার রঘুদা থাকবে , কোনো অসুবিধা হবে না । আর রঘুদার ফোন নম্বরটাও আমায় দিয়ে দিল ।

     যাই হোক সকাল সকাল বেরোবো ভাবলেই তো আর হয় না , বাড়ি থেকে কোথাও বেরোতে গেলে কপালেও থাকা চাই । তো শুক্রবার সকলেই একটা কাজ এসে পড়ায় তা মিটিয়ে বেরোতে বেরোতে এগারোটা বেজে গেল । একটা ট্যাক্সি ধরে শিয়ালদা পৌঁছে ক্যানিং - এর টিকিট কেটে ট্রেনে চেপে বসলাম । ট্রেনে খুব ভিড় থাকলেও জানালার ধারে একটা সিট পেয়ে বসে আনন্দই হচ্ছিল । এতখানি রাস্তা যেতে হবে তাই বসতে পেয়ে ভালো লাগছিল ।

     ট্রেন ছাড়ল বারোটা পাঁচ এ । কিছুক্ষণ পরই বুঝতে পারলাম এই ট্রেনে ভিড়ের জন্য বসে থাকা আর না থাকার মধ্যে কোনো তফাতই নেই । সেই ভিড়ের মধ্যেই আবার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হকার তাদের কাছে কি আছে তা বলে চলেছে । ট্রেনও চলছে তার নিজের মত করে । পাল্লা দিয়ে গরমও বেড়ে চলেছে ।

     চলতে চলতে প্রায় আড়াইটের দিকে ক্যানিং এ পৌঁছালাম । স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাসস্ট্যাণ্ডে পৌঁছালাম । কিন্তু বাসন্তীর বাস ছাড়তে এখনও প্রায় আধ ঘন্টা বাকি । এই দুপুরের গরমে কিছুই যেন ভালো লাগছে না । কি করি , পাশে একটা চা - এর দোকান দেখে বসে পড়লাম । অনেক রিকোয়েস্টের পর চা - এর অর্ডার নিল । সঙ্গে ডিমভাজা বলতেই হল ।

     তিনটে দশ এ বাস ছাড়ল । বাসে যাত্রী বলতে আমাকে নিয়ে সাতজন । বাকি ছয়জনের মধ্যে তিনজন সব্জী বিক্রি করে বাড়ি ফিরছে । বাসও চলেছে খুবই আস্তে । প্রায় সব জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ছে । কিন্তু যে বলবো তারও উপায় নেই ।

      বাসে বসে থাকতে থাকতেই দেখি আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে । আর প্রায় চারটের দিকে চারিদিক অন্ধকার করে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল । এই রকম বৃষ্টি , আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে ঝড় । এইরকম প্রাকৃতিক তাণ্ডবের মধ্যে আবার ড্রাইভার একটা স্টপেজে বাসটিকে দাঁড় করিয়ে দিল দেখলাম একমাত্র আমি ছাড়া আর কারোর কোনো তাড়া নেই যেন । যখন কোনো কিছুতেই লাভ হয় না , তখন আমিও তাদের সাথেই প্রকৃতির তাণ্ডবলীলা উপভোগ করতে লাগলাম । কারণ অবশ্যই গরমের হাসফাসানি কমে যাওয়া ।

     যখন ঝড় বৃষ্টি কমে এল , প্রায় পাঁচটার দিকে আবার বাস ছাড়ল । দেখলাম কিছু প্যাসেঞ্জার বেড়েছে । তাদের নিজেদের মধ্যে নানা রকমের কথা শুনতে শুনতে চলেছি । কখনও জানালা দিয়ে বাইরের চারপাশ দেখি । আর কৃত্রিমতার ছোঁয়া যে চারদিক ছেয়ে ফেলেছে , তা দেখি । ছয়টার দিকে যখন বাসন্তীতে পৌঁছালাম , তখন কে বলবে আজ দুপুরে বাসের জন্য এক মিনিট দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছিলো ।

     পাশে একটা দোকান দেখে , টিফিন করার সিদ্ধান্ত নিলাম । যা ভাবা তাই কাজ । কিন্তু দোকানটায় যা শুনলাম তাতে আমার চোখ কপালে ওঠা ছাড়া আর কোনো গতি নেই । বাসন্তী থেকে মাজিদবারি যাওয়ার শেষ বাস বেরিয়ে গেছে প্রায় পাঁচটার দিকে । কি আর করা যায় । শেষে অনেক চেষ্টার পর ঐ দোকানদারই একটা লরিতে তুলে দিল । যাই হোক দোকানদারটিকে অনেক অনেক ধন্যবাদ দিয়ে লরিতে উঠে বসলাম । লরিতে কিছু মাল নিয়ে এসেছিল । এখন খালি ফিরছে ।

     লরিতে বসে যাচ্ছি তো যাচ্ছি । এই সময় আবারও বৃষ্টি শুরু হল । আজ নিশ্চয়ই ঘুম থেকে উঠে আয়নায় চোখ পড়েছিল । ভাবলাম প্রদীপদাকে ফোন করে জানিয়ে দিই , আমি বাসন্তী পৌঁছে গেছি । ফোনও বের করলাম । কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয় , এই বৃষ্টিবাদলার মধ্যে কখন যে নেটওয়ার্ক বসে গেছে বুঝতে পারিনি । আর কি করি ! এবার যেন একটু চিন্তা হতে শুরু করল । প্রদীপদা একবার বলেছিল মাজিদবারি থেকে গোসাবা পর্যন্ত খেয়া রাত আটটার পর বন্ধ হয়ে যায় । আবার ভাবলাম এখন আর চিন্তা করেই কি হবে ! যা থাকে কপালে । শেষে না হয় লরির ড্রাইভার - খালাসীকে বলে কিছু একটা ব্যবস্থা করে নেব ।

হঠাৎই চমক ভাঙল নীচে থেকে ড্রাইভারের ডাকে । বুঝলাম , নানা কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম , আর এর মধ্যেই মাজিদবারি এসে গেছে । লরি থেকে নেমে পড়লাম । পাশেই একটা ধাবা মতন রয়েছে । সেখানেই ড্রাইভার ও খালাসী রাতে থাকবে । ঘড়িতে দেখলাম সবে সারে আটটা বাজে । ড্রাইভারকে আবারও অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে একটা একশো টাকার নোট তার দিকে বাড়াতেই ড্রাইভার দাদা তো নাক কান মুলে কত কি ! সে যে নিতে পারবে না তা বোঝানোর জন্য অনেক কথা বলে গেল । শেষে বলল যদি মাল খাওয়ার জন্য দেন তো নিতে পারি ।

     তাদের বিদায় জানিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খেয়াঘাটে এসে পৌঁছালাম । সেখানে প্রায় কেউ নেই । কয়েকজন শুধু বাংলার বোতল নিয়ে জটলা করছে । তাদের কাছেই এগিয়ে গেলাম । তাদের সাথে কথাবার্তায় বুঝলাম তারা প্রত্যেকেই মাঝি । কিন্তু এতরাতে কেউই গোসাবা যেতে রাজি নয় । তাদের সারে আটটার কথা বলায় , দেখলাম সবাই কেমন মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে । একজন তো বলেই ফেলল , বাবু আমরা মদ খাই , কিন্তু মাতাল নই । ভালো করে ঘড়িটা দেখেন । তো আমি ঘড়িতে আবারও সারে আটটা দেখে বুঝলাম সারে আটটার সময় আমার ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ।

      যাই হোক তাদেরই একজন জানালো যে তখন সারে এগারোটা বাজে । তাদের যখন অনেক করে বললাম , তখন বেশি ভাড়ায় একজন আমাকে খেয়া পারাপারে রাজি হল । কিন্তু যদি অন্য কাউকে পায় তো তাকে তুলে নেবে । আমি তো হাতে স্বর্গ পেলাম । এতরাতে মনে হয় না আমার মতো কেউ আছে বলে । জিজ্ঞাসা করার পর জানলাম মিনিট দশেক লাগবে গোসাবায় যেতে । তবে আজ বৃষ্টি বাদলার দিন তো তাই একটু বেশি লাগতে পারে ।

     কি আর করা যায় ! সঙ্গীদের সাথে আরও কিছুক্ষণ কাটানোর পর মাঝিভাই উঠলেন । কিন্তু এত মদ খেয়েছে যে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না । এই ঝড়বৃষ্টির রাতে মাতাল অবস্থায় থাকা মাঝির সাথে যাব কিনা ভাবছি । না গিয়ে উপায়ই বা কি ? অগত্যা  . . . . .  , আমার অবস্থা বুঝতে পেরে অন্য একজন বলে উঠল , আপনার কোনো ভয় নেই , আসগার ভাইকে কোনো ভাবে তুলে একবার স্টিয়ারিং এ বসিয়ে দিলেই হল । ওর আর কোনো অসুবিধা হবে না । কিন্তু কি হবে আর কি হবে না সে তো আমিই বুঝচি !

      যা থাকে কপালে ! নৌকায় উঠেই পড়লাম । ততক্ষণে ইঞ্জিন লাগানো নৌকা তার আওয়াজ শুরু করে দিয়েছে । যাই হোক মিনিট দশেক মতই লাগলো । গোসাবায় নামলাম । কিন্তু ভাটা থাকার জন্য বোধহয় জেটিতে না লাগিয়ে কাঠের পাটাতন ফেলে আমায় কাদার মধ্যে নামিয়ে দিল । ভাড়া চুকিয়ে কোনো রকমে কাদা থেকে উঠে এলাম । মোবাইল বের করে দেখি এখনও কোনো নেটওয়ার্ক নেই ।

এত রাতে কি আর করি । কোথায় যাব । কোনো দোকানপাটও খোলা দেখছি না । তার উপর আবারও টিপ টিপ করে বৃষ্টি নামল । পকেট হাতরে একটাও সিগারেট পেলাম না । কি করব ভাবছি । হঠাৎ বেশ খানিকটা দূরে একটা আলো দেখতে পেলাম । তো সেদিকে এগিয়ে গেলাম । সেটি একটা পান বিড়ির দোকান । কিন্তু আমার কথা শুনে দোকানদার তো বলেই ফেলল যে , আমি নাকি খুব ভুল কাজ করে ফেলেছি । এখানে থাকার মতো কোনো জায়গাই নেই । এদিকে খুব খিদেও পেয়েছে । যাই হোক ঐ দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট ও বিস্কুট কিনলাম । ভাগ্যচক্রে দোকানদারটি প্রদীপদাকে চেনে । কিন্তু ঐ পর্যন্তই । জানতে পারলাম আর কিলোমিটার পাঁচেক মতো পথ । একটাই রাস্তা , মাঝে এক জায়গায় দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে । আমায় যেতে হবে বামদিকের পথে ।

      এখন প্রায় বারোটা বাজে । ঘন্টা খানেক হাঁটলে হয়তো পৌঁছে যাব । কিন্তু রাতে যদি পথ ভুল করি । তার উপর টিপ টিপ করে বৃষ্টিও পরছে । যদিও আমার জামা কাপড় প্রায় পুরোটাই ভিজে গেছে । এই অবস্থায় কি আর করি ! একটা সিগারেট ধরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম । অন্ধকারে ঠিক বোঝাও যাচ্ছে না । তবে রাস্তার দুপাশে গাছ থাকায় খুব একটা অসুবিধাও হচ্ছে না । ভাবছি এত রাতে এই প্রথমবারের জন্য যখন প্রদীপদার বাড়িতে ঢুকবো , ওদের বাড়ির অন্য সদস্যরা কি ভাববে ?

       হয়তো মিনিট দশেক এসেছি । হঠাৎ পিছন থেকে আলো জ্বেলে একটা গাড়ি আসতে দেখলাম । আমি তো রাস্তার মাঝেই দুই হাত উপরে তুলে তাকে থামার অনুরোধ জানাচ্ছি । কিন্তু গাড়ির গতি কমার কোনো লক্ষণই নেই । এবার রাস্তার মাঝ থেকে সরে যাব ভাবছি , সেই সময়ই মারুতি ভ্যানটা আওয়াজ করে ব্রেক কষে আমার পাশে থামল । অন্ধকারে গাড়ির রংটিও ভালো করে বুঝতে পারলাম না । ড্রাইভারের সিটে একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক , মুখে ছোটো ছোটো খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি । কিন্তু এই গরমের দিনেও একটা মাফলার গলায় জড়ানো । তো সেদিকে আমার তখন লক্ষ্য দেওয়ার সময় নয় । তাকে যখন দুলকি যাবার কথা বললাম , তখন ঐ ড্রাইভার দাদাই জানালো যে তার নাম রঘুবীর হাজরা । প্রদীপদার বাড়ি থেকেই এসেছে আমাকে নিয়ে যাবে বলে । বিকেলের ঝড়ের আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ।

     এই একটু আগেই বাবলুর পান বিড়ির দোকানে জেনেছে আমি হেঁটে যাচ্ছি । তাই আমার পিছনে এসেছে , আমাকে প্রদীপদার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তারপর ছুটি । আমিও আর সময় নষ্ট না করে সামনের সিটে উঠতে গেলে হঠাৎ রঘুদা পিছনের সিটে বসতে বলল । আমিও আর বাক্য না বাড়িয়ে পিছনে গিয়ে উঠলাম ।

      গাড়িতে ওঠার পরই আমার কেমন যেন একটা গন্ধ নাকে এল । রঘুদাকে বলতে জানালো যে একটু নোংরা হয়েছে । আমাকে নামিয়ে দিয়ে পরিষ্কার করে নেবে । কিন্তু গন্ধটা কিসের তা কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না । রঘুদাও গাড়িতে স্টার্ট দিল । পিছনের সিটে বসলেও হেডলাইটের আলোয় তখন বাইরের রাস্তার সব কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম ।

      কিছুক্ষণ চলার পর দেখতে পেলাম সত্যিই রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গেছে । কিন্তু রঘুদা ডানদিকের পথ নিল কেন ? বাবলুর দোকানে তো শুনলাম বাঁদিক দিয়ে গেলে তবে দুলকি । তবে কি রঘুদার ছদ্মবেশে অন্য কেউ আমায় ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে ? মনের মধ্যে উত্তেজনা চেপে না রেখে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম । শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রঘুদা জানালো বিকেলের ঝড়বৃষ্টির আগে হলে বাম দিক দিয়েই যেত । কিন্তু বিকেলের ঝড় আর বৃষ্টিতে ঐ রাস্তায় অনেক গাছ উপড়ে পড়ে আছে । এখনও সব পরিষ্কার হয়নি । তাই প্রায় পনেরো কিমি ঘুরে ডানদিক দিয়ে যেতে হবে ।

কি আর করি ! তবে রঘুদার হাতে যেন জাদু আছে । এই বর্ষা বাদলের রাতে যে ভাবে গাড়ি চালাচ্ছে তাতে বেশিক্ষণ লাগবে বলে মনে হয় না । তারপর থেকে আর কোনো কথাও হয়নি । হঠাৎই দূরে আলোর রেখা জেগে উঠছিল । এইরকমই একটা জায়গায় , হয়তো দৃশ্যমান আলো থেকে বড়জোড় পঞ্চাশ মিটার দূরে রঘুদা গাড়ি থামালো । আর জানালো সামনে যে বাড়িটায় আলো জ্বলছে সেটাই প্রদীপদার বাড়ি । ও আর যাবে না । গাড়িটা একটু পরিষ্কারও করতে হবে । প্রদীপদার বাড়ির সবাই এখনও জেগে আছে ।

      ভাবলাম আমি আসব জানে । একে এতো দেরি হচ্ছে । তার উপর নেটওয়ার্ক বসে যাওয়ার জন্য কোনো খবরও পাচ্ছে না । তাই হয়তো জেগে আছে । দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক । আজ যে কিভাবে শিয়ালদা থেকে প্রদীপদার বাড়িতে পৌঁছেচি , তা শুধু আমিই জানি । আর দেরি না করে ব্যাগটি কাঁধে নিয়ে সবে একটু এগিয়েছি , ভাবলাম রঘুদাকে বলি এতোটা যখন এলে , তো প্রদীপদার বাড়ি থেকেই ঘুরে যাও না । পিছনে ফিরেই . . . . . .

       একি ! এইমাত্র যে গাড়িটা করে আমি এতটা পথ এলাম তা গেল কোথায় ? গাড়ি গেলেও তো আওয়াজ হবে । আমি কোনো আওয়াজ পেলাম বলে তো মনে হলো না । ভাবলাম আজ এতোটাই টায়ার্ড , আর একের পর এক যা ঘটে চলেছে তাতে আর কিছু না ভেবে প্রদীপদার বাড়ির দিকে এগিয়ে যাই ।

        দূর থেকেই দেখতে পেলাম এত রাতেও প্রদীপদা বাড়ির বাইরে রয়েছে । আরও কয়েকজন বয়স্ক ভদ্রলোক । কেমন যেন একটা শোকাচ্ছন্ন ভাব । কিছু যে একটা হয়েছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না । কিন্তু এত রাতে হেঁটে হেঁটে আমাকে আসতে দেখে প্রায় ছুটেই প্রদীপদা আমার কাছে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল , ফোন তুলছিলি না কেন ?

       ফোন তো সেই বিকেল থেকে বন্ধ । কোনো নেটওয়ার্কই নেই । আমিও অনেক বার তোমার সাথে যোগাযোগ করার কথা ভেবেছি , কিন্তু পারিনি । এইসব কথার মাঝেই জ্যেঠিমা এবং বৌদি বাড়ির ভিতরে ডাকল । বাড়ির ভিতরে ঢুকতে ঢুকতেই প্রদীপদা জিজ্ঞেস করল গোসাবা থেকেই হেঁটে আসছি কিনা ? আমি বললাম গোসাবা থেকে হাঁটা শুরু করার পরই রঘুদা গাড়ি নিয়ে আমার কাছে আসে এবং এই একটু আগেই নামিয়ে দিয়ে হঠাৎই কোথায় যেন চলে গেলো । সবাইকে থামিয়ে দিয়ে জেঠু বললেন , আজ আর কোনো কথা নয় । শরীর নিশ্চয়ই খুব টায়ার্ড । আজ যেন খেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে নিই । কাল অনেক কাজ আছে । দেখলাম কেউই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে যে যার মতো আলাদা আলাদা হয়ে গেলো । আমিও একটা ঘরে বিশ্রাম করতে চলে গেলাম ।

      পরদিন সকাল থেকেই কেমন যেন একটা বিষাদের ছায়া দেখলাম । কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না । প্রদীপদাকে জিজ্ঞেস করেও কোনো উত্তর পাইনি । শুধুমাত্র প্রদীপদা একবার আমায় বলল আমি ঠিক রঘুদার সাথেই এসেছিলাম তো !

       দেখো প্রদীপদা , আমি তো রঘুদাকে চিনি না , তবে সে তার নাম রঘুনাথ হাজরা বলেছিল । তার মুখে খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি ছিলো । গলায় মাফলার ছিলো ।

       প্রায় তখন সকাল নটা , হঠাৎ একটা পুলিশের জিপ এসে প্রদীপদাদের বাড়ির সামনে থামল । একজন পুলিশ এগিয়ে এসে বাড়ি থেকে কোনো একজনকে নিয়ে যেতে চাইলো । কি যেন আইডেনটিফাই করতে হবে । আর কি সব ক্রেন , গাড়ি নিয়ে কথা বলছিল । যাই হোক , কি হয়েছে জানার জন্য প্রদীপদার সাথেই পুলিশের জিপে গিয়ে উঠলাম । জিপ সোজা থানায় নিয়ে গেলো । সেখানে প্রদীপদা ও . সি . র সাথে কথা বলা শুরু করল । জানালো তাদের গাড়ির নম্বর , কাগজপত্রও দেখালো । কিন্তু কি হচ্ছে তা এখনও আমার মাথায় ঢুকছে না । ও . সি . জাানালো দু এক দিন পর থানা থেকে গাড়িটি নিয়ে যেতে এবং আমাদের ছেড়ে দিল । দেখলাম যে জিপটি করে আমরা এসেছিলাম তার ঠিক পিছনে একটা সাদা রঙের মারুতি ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে । দেখে বোঝা যায় গাড়িটির উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে । ছাদের খানিকটা অংশ বেঁকে নিচের দিকে ঢুকে গেছে । প্রদীপদা তাড়া দিল , আমিও মারুতি ভ্যানটির পাশ দিয়ে গিয়ে জিপে উঠলাম । মারুতির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটা চেনা গন্ধ নাকে লাগল । কিন্তু কিসের গন্ধ বুঝতে পারলাম না ।

     দুপুরে সবাই যখন একসাথে খেতে বসলাম , তখন আর চুপ করে না থেকে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম , কি হয়েছে ?

     জেঠু বললেন , কাল রঘু ছুটি চেয়েছিল । আমার আসার কথা থাকায় , আমাকে গোসাবা থেকে এনে দিয়ে বাড়ি যাবে কথা ছিলো । সেই মতো বিকেল চারটের দিকে বাড়ি থেকে বের হয় । বৃষ্টি তখন শুরু হয়ে গেছে । জ্যেঠিমা বারন করেছিল । বৃষ্টি থামলে যাবার কথাও বলেছিল । কিন্তু যদি আমাকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় , তাই ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়েই রঘুদা আমাকে নিয়ে আসার জন্য বেরিয়েছিল । মাঝ পথেই প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যে একটা গাছ উপড়ে রঘুদার গাড়ির উপর পড়ে । এখানেই শেষ নয় , ঝড়ের দাপটে গাড়িটি পাল্টি খেয়ে পাশের নোংরা ড্রেনের মধ্যে পড়ে । কোনো কারনে রঘুদার মাথায় চোট পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় । সেই অবস্থায় ড্রেনের মধ্যেই সারে আটটা পর্যন্ত পড়ে ছিলো । সারে আটটার দিকে একজন বাইকে করে যাওয়ার সময় দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয় । পুলিশ এসে লাশ তুলে নিয়ে গেলেও রাতে গাড়ি তুলতে পারেনি । আজ সকালে ক্রেন এনে টেনে গাড়ি তুলে থানায় রেখেছে । পোস্টমর্টেম হয়ে গেলে আজ বিকেলে রঘুদার বডি দিয়ে দেবে ।

       এই পর্যন্ত শোনার পর আমার কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয় , বুঝতে পারছিলাম না । বিকালে প্রদীপদার সাথে যখন মর্গে গেলাম , তখন আমাকে চিনিয়ে দিতে হয়নি , সেই মাফলার গলায় পাকা দাড়ির মানুষটিকে , যে কিনা কাল ছুটি চেয়েছিলো । 

Wednesday, 24 February 2016

কলসী

    স্কুল থেকে ফিরে একটা কাজে একবার সন্ধ্যের সময় আমতায় যেতে হয়েছিল । তো কাজ মিটতে মিটতে বৃষ্টি নামল । ফলে বসে বসে গল্প , সঙ্গে পিঁয়াজ , কাঁচালঙ্কা , ছোলা , শশা সহযোগে মুড়ি । ব্যাপারটা বেশ জমে উঠেছিল । আর বাইরের বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গল্পে ভূত ঢুকতে দেরি করেনি । আবার সেই ছোটবেলায় বাবার কাছে শোনা নানা ভূতের গল্পে জমে উঠছিল । কিন্তু বাধ সাধল বৃষ্টিটা হঠাৎই যেমন এসেছিল তেমন হঠাৎই থেমে গেল । আর আমাকেও অনেকটা রাস্তা ফিরতে হবে তাই উঠে পড়লাম ।
    মাঘের শেষে শীত কমে এলেও বৃষ্টির পর রাতে একটু শীত শীত করছিল । তবে খারাপ লাগছিল না । চারিদিকের বৃষ্টির পরের জ্যোৎস্নার নিস্তব্ধ রূপ দেখতে দেখতে উৎফুল্ল মনে আসছিলাম । কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজে বাইকটার কি হয়েছে জানি না , মাঝ রাস্তাতেই বন্ধ হয়ে গেল । এখনও অনেকটা রাস্তা যেতে হবে । ফাঁকা মাঠের মধ্যে দিয়ে রাস্তা । কোনো দোকানপাটও নেই । কি আর করি ! কয়েকবার স্টার্ট দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করলাম । অগত্যা , মাথা থেকে হেলমেটটি খুলে বাইকটি টেনে নিয়ে চললাম ।
    একটু একটু করে এগোই , আর বিশ্রাম নেওয়ার নামে একটা করে সিগারেট ধরাই । এইভাবে এগোতে এগোতে দেখতে পাচ্ছি ঐ যে দূরে আমাদেরই গ্রামের শ্মশানের পাশ দিয়ে রাস্তা গিয়ে গ্রামে ঢুকেছে । আর তো একটুখানি । তারপরই বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিতে পারবো ।
    এই বিশ্রামের কথা ভাবতে ভাবতেই শ্মশানের পাশে এসে পড়লাম । আঃ ! এ কি দেখছি । চারিদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধুই ঝিঁঝিঁর ডাক । শ্মশানের পাশের পুকুরের জলে শত শত চাঁদ । অপূর্ব শোভা দেখতে দেখতে চমকে উঠলাম । রাস্তার উপর দিয়ে একটা মাটির কলসী এগিয়ে আসছে । একটু এগোয় , তারপরই থেমে যায় । আবার একটু এগিয়ে আসে । হাতের কাছে কোনো আলোও নেই । জ্যোৎস্না আছে , কিন্তু রাস্তার পাশের বড় বড় গাছ ভেদ করে রাস্তায় আলো খুবই কম ।
    তো আমার মন আবারও উৎফুল্ল হয়ে উঠল । যাই হোক , এতদিন পর একটা ভূতের দেখা পেলাম । আমার জীবন আজ স্বার্থক । একথা তাহলে সত্যি । এতদিন না মানলেও আজ নিজের চোখে দেখে অবিশ্বাস করি কিভাবে ? মাটির কলসী শ্মশানে থাকবে , এতে আমি কিছু  অস্বাভাবিক না দেখলেও মাটির কলসী নিজের থেকে এগিয়ে আসে , এটা আগে কখনও কারোর কাছে শুনিনি ।
    কিছুতেই মন মানতে চাইছিল না । যা দেখছি , তা কি ঠিক নয় ? কিন্তু চোখের সামনে এখনও দেখতে পাচ্ছি । আমার কেমন যেন বোধ শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে । কোনটা ঠিক ? মন না চোখ !
     যাই হোক , অহেতুক আর সময় নষ্ট করা যায় না । বাইকটা দাঁড় করিয়ে কলসীর দিকে এগিয়ে গেলাম । ততক্ষণে কলসীটিও রাস্তা থেকে মাঠের দিকে নেমেছে । ঐখানটায় অন্ধকার একটু বেশি । আবারও চমক লাগার পালা ।
    চমকে উঠলাম একটা শিয়ালের ডাকে । আর দেখলাম , রাস্তা থেকে কলসীটি নামার সময় একটা ইটের টুকরোয় ধাক্কা লেগে ভেঙে যাওয়ার ফলে মাথা থেকে কলসীমুক্ত হয়ে শিয়ালটি ডেকে উঠেছে । তারপর সেখান থেকে পালাতে সময় নেয়নি । আর মন না চোখ কোনটি ঠিক বুঝতে আমারও কোনো অসুবিধা হয় নি ।