Tuesday, 8 March 2016

রত্নগুহা , 2

        হোটেলে ফিরে আসার পর থেকে কতকগুলি প্রশ্ন আমার মাথার মধ্যে ঘুরেই চলেছে । যেদিন থেকে ধুন্চে এসেছি , সেদিন থেকেই প্রশ্ন গুলি ঘুরছে । নেপালের এই শৈলশহরের এমন এক অবস্থান যেখান থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আহোরণ করা খুব সহজ । কিন্তু তা সত্ত্বেও এই শহরের খুব বেশি একটা উন্নতি হয়নি । এখন অবশ্য অনেক লোক বেড়াতে আসে । তবে ধুন্চেতে টুরিস্ট থাকে খুব কম । তাই হোটেলের সংখ্যাও কম । তবে খুব একটা অসুবিধা নেই । সামান্য পয়সা দিলেই এখানে গেস্ট হাউসে রাত্রিবাস করা যায় । যাই হোক প্রশ্ন গুলিতে আসা যাক ।

       আমি কোনো জায়গায় দেখিনি যে গাড়িতে এলাম , তাদের বললাম তোমরা এগিয়ে যাও , আমি এখানে একটু ঘুরে হোটেলে ফিরব , এটা বলার সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিয়েছে । হয়তো অনেক জায়গাতেই আমাকে বাদানুবাদে জড়াতে হয়েছে । কিন্তু এখানে একবার বলতেই মেনে নিল । যেন আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো । শুধু আমাকে এখানে নামিয়ে দিয়ে গেল ।

       আর সেই নরম পাথর আর নদী । আর সেই সুতোর মতো অংশ গুলোই বা কি ? হোটেলে ফিরেও খুব একটা উপকার হল না । এটা ওটা ভাবতে ভাবতে ল্যাপটপে আজকের তোলা ছবি গুলো দেখছিলাম । হঠাৎ মনে হল গুহার ভিতরের লেখা গুলো তো চীনা ভাষাও হতে পারে । চীনা হরফের মতো অনেক গুলো হরফ গুহার ভিতরের ছবির মধ্যে পেয়েছি । খুব আফশোস হচ্ছিলো , চীনা ভাষাটা না জানার জন্য । কি আর করা যায় ! ভাবতে ভাবতে ছবিগুলো দেখতে দেখতে সবে একটা সিগারেট ধরিয়েছি , হঠাৎ ডোরবেল বেজে উঠলো ।

           উঠে দরজা খুলে দেখি , হোটেলের ম্যানেজার ডাকতে পাঠিয়েছে । কারা যেন আমার বর্ণনা দিয়ে আমাকে খোঁজ করছিল । ইচ্ছা না থাকলেও ল্যাপটপটা বন্ধ করে বিছানায় রেখে নীচে ম্যানেজারের রুমের দিকে রওনা দিলাম । সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই একটা চেনা গলা শুনতে পেলাম । এইরে , এরা তো আমায় আমার সাথে এখন আসবেনা বলল ।

      আমি কলকাতা থেকে রওনা দেওয়ার আগেই শুভঙ্কর আর দীপাঞ্জন কে আসার কথা জানিয়েছিলাম । ওদেরও একসাথে আসার জন্যও বলেছিলাম । তখন না করেছিল । তাই আমি শুধু একার জন্যই সব ব্যবস্থা করে বের হই । শেষ মুহূর্তে তো ভিসায় আটকে যাচ্ছিলাম । শেষে দীপাঞ্জনই তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করে দেয় । কিন্তু কোনো ভাবেই পনেরো দিনের বেশি ভিসা পাইনি ।

       আমি যখন ওদের আমার সাথে নেপালে যাওয়ার কথা বলি তখনই ওরাও ঠিক করে নেপালে এসে আমায় সারপ্রাইস দেবে । আমাকে না জানিয়েই একই সাথে ভিসার জন্যও আবেদন করে । তাদেরও পনেরো দিনের ভিসা মঞ্জুর হয়েছে ।

     তো আমি কলকাতা থেকে ট্রেনে সমস্তিপুর হয়ে মজফ্ফরপুরে এসে নামি । সেখান থেকে ট্রেন চেঞ্জ করে মোতিহারী । এবারে সড়কপথে চাপয়া , সাগাউলি , রামগড়য়া হয়ে রাক্সুয়াল । এখানেই ভারত নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্রামপুর । তারপর সোজা রাস্তা , বীরগঞ্জ , আমলেখগঞ্জ , হেটৌড়া হয়ে কাঠমাণ্ডু । সেখানে রাতে থেকে পরদিন সকালে বেরিয়ে শিবপুরী নাগার্জুন ন্যাশানাল পার্কে ঘুরে সন্ধ্যার দিকে ধুন্চে । আগে থেকেই হোটেল ঠিক করা থাকায় কোনো অসুবিধা হয়নি ।

      গতকাল সন্ধ্যায় যখন এই হোটেলটায় উঠলাম , তখনও মনে হচ্ছিলো শুভঙ্কর ও দীপাঞ্জন এলেই বোধ হয় ভালো হতো । আর এখন এই হোটেলেই তাদের দুজনকে দেখে যে কি আনন্দ হচ্ছিলো তা বলার মতো নয় ।

       এখানে আমাদের পরিচয় গুলো একটু দিয়ে রাখি । আমি মানে বিট্টু সাহা , একটা কলেজে জুলজি পড়াই । শুভঙ্করের নিজের একটা স্টুডিও আছে । আর বাকি সময় ভ্রমণ নিয়েই পড়ে থাকে । দীপাঞ্জন জিওলজি নিয়ে পাশ করার পর ONGC তে কর্মরত । তবে আমাদেরই মতো সেও ভ্রমণ পাগোল ।

          নীচে ম্যানেজারের সঙ্গে কথাবার্তার পর ওদের রুমে নিয়ে এলাম । আমার পাশের রুমটিও আমাদের দিলেও রাতে আমরা একসাথে একই রুমে থাকবো ঠিক করলাম । রুমে ঢোকার পর ওদের ফ্রেশ হয়ে নিতে বললাম এবং আজ সকাল থেকে কি কি হয়েছে তা ওদের জানালাম । ল্যাপটপে ছবিগুলিও দেখাচ্ছিলাম । ছবিগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎই শুভঙ্কর গুহার ভিতরের দেওয়ালের একটা ছবিকে দেখতে বলে । আমিও অনেকক্ষণ ধরে ছবিটা দেখার পরও আলাদা ভাবে কিছু বুঝতে না পেরে ওকে এটা দেখার কারণ জিজ্ঞাসা করি । শুভঙ্কর জানায় দেখ মানুষ গুলির যে ছবি পাশে রয়েছে তার তুলনায় পোকা গুলির আকার যেন অনেক বড় বড় ।

          আমিও হলপ করে বলতে পারি এইরকম এতবড়ো গুবরে পোকার কথা আগে কখনও শুনিনি । এখন যদি লেখা গুলি পড়তে পারতাম । তিনজনে এই নিয়েই আলোচনা হচ্ছিলো । হঠাৎ দীপাঞ্জন বলল , আচ্ছা ম্যানেজার বাবুকে জিজ্ঞাসা করলে হয় না ? যদি এখানে চীনা ভাষায় দক্ষ কেউ থেকে থাকে । যা ভাবা তাই কাজ । আবারও ছুটলাম ম্যানেজার বাবুর কাছে । আমাদের কথা শুনে তিনি জানালেন যে , তিনি একটু আধটু চীনা ভাষা জানেন । তিনি আমাদের হেল্প করতে সম্মত হলেন ।

          তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে রুমে এলাম । ছবি গুলি তিনি অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন । লেখা গুলিও দেখলেন । তিনি দেখছিলেন আর মাঝে মাঝেই তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ছিল । কিন্তু তিনি কোনো কথা বলছিলেন না । অনেকক্ষণ আমাদের অপেক্ষায় রাখার পর তিনি জানালেন যে পুরোপুরি এই লেখার অর্থ তিনি বুঝতে পারেননি । তবে যেটুকু বুঝতে পেরেছেন তা অতি ভয়ংকর ।

       এখানে একটা গোবরে পোকার কথা বলা হয়েছে । যা হান বংশের রাজা মিজান এর আমলের । রাজা মিজানের রাজত্বকালে দক্ষিণ প্রদেশে হঠাৎই এই ধরনের গোবরে পোকার সংখ্যা বেড়ে যায় । এই পোকাগুলি আকারে এতটাই বড় ছিলো যে তারা মানুষকে আর ভয় পেত না । শুধু তাই নয় , এক সময়ে পোকাগুলি মানুষকেও আক্রমণ করা শুরু করে । সমস্ত ফসলের বারোটা বাজিয়ে দেয় । শেষে দক্ষিণ প্রদেশ থেকে লোকজন ভয়ে পালাতে শুরু করে ।

       এই পর্যন্তই তিনি উদ্ধার করতে পেরেছেন । আর তাতেই বিপত্তি গেলো বেড়ে । কি সেই পোকা ? এটা তো তাহলে মানুষের কাছে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নথি । কিন্তু এরপর কি করে জানব বাকিটা কি ? হাতে প্রায় দিন দশেক সময় আছে । কিন্তু এই কাজের জন্য দশ দিন যথেষ্ট নয় । যাই হোক , ঠিক করে ফেলি , এই দশ দিনে যতটুকু এগোনো যায় এগোই। বাকিটা পরের বার এসে হবে । ম্যানেজারবাবুকে আমাদের ভাবনার কথা জানালে উনিই ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্টেটকে বলে সব ব্যবস্থা করে দেবে বলে জানালেন ।

       পরদিন শুধু এদিক ওদিক ঘুরেই কেটে গেল । সব কাগজপত্র জোগাড় করতে আবারও একবার কাঠমাণ্ডু যেতে হল । ঠিক হল আমি , শুভঙ্কর , দীপাঞ্জন , ম্যানেজারবাবু ও আরও আটজন স্থানীয় আদিবাসী একসাথে পরদিন সকাল ছয়টার সময় রওনা দেব । আমাদের সাথে প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছু উপকরণ নিয়ে নিলাম । বারোদিন চলতে পারে এরকম শুকনো খাবার নিয়ে নিলাম । দড়ি , গাঁইতি বন্দুক , তাঁবু , প্রায় সব কিছুর ব্যবস্থাই ম্যানেজারবাবু করে দিলেন ।

        সকালে যখন বেরোতে যাচ্ছি তখন ম্যানেজারবাবু একটা চিঠি আমাদের দিলেন । রাতেই কাঠমাণ্ডু থেকে পাঠিয়েছে । তাতে লেখা রয়েছে , আমাদের ট্রেকিং এর পারমিশন দিলেও যেহেতু আমরা ভারতীয় এবং এই ট্রেকিং এর সঙ্গে চীন এর সম্পর্ক জড়িত এবং তা পুরোপুরি অজানা ভূগর্ভস্থ পথে । তাই আমাদের রক্ষা করার সাথে সাথে যাতে কোনো গণ্ডগোল না হয় , আমাদের সাথে দুই জন নেপালী আর্মি অফিসার যাবেন । এতে আমাদের যে অসুবিধা হবে , তার জন্য নেপাল সরকার ক্ষমাপ্রার্থী ।

       চিঠিটা পড়ে আমাদের তো আনন্দই হল । একে তো বিদেশ বিভুঁয়ে বহু বছরের পুরানো লেখাকে বিশ্বাস করে এগিয়ে যাওয়া । তার উপর আবার ভূগর্ভস্থ পথে । শুরু করার কতদিন পরে যে আবার সূর্যালোক দেখতে পাব তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই । কিন্তু অফিসারদ্বয়ের দেখা তো মেলে না । আমরা প্রত্যেকেই রেডি হয়ে চুপচাপ বসে আছি । যাই হোক সারে সাতটার দিকে একটি পুলিশের গাড়ি হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ালো । দেখলাম তা থেকে তিনজন নামলেন ।

          আমাদের দিকে এগিয়ে এসে পরিচয় দিলেন । তাদের মধ্যে দুজন আর্মি অফিসার ও একজন বিদেশ মন্ত্রকের লোক । বিশেষ প্রয়োজনে আমাদের ভিসার মেয়াদ আরও পনেরো দিন বাড়ানো হয়েছে । তা আমাদের জানাতে ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র আমাদের দিতে এসেছে ।

       সত্যি কথা বলতে কি , আমার যে তখন কি আনন্দ হচ্ছিলো তা বলার নয় । আর্মি অফিসার দুজনে দেখলাম ভালোই হিন্দি জানে । ফলে আমাদেরও সুবিধা হচ্ছিলো । ঠিক হল নটার দিকে আমরা যাত্রা শুরু করব ।

        হোটেলেই প্রত্যেকে টিফিন করে নিলাম । ঠিক হয় গুহার মুখে গিয়ে আবার থামা হবে । গত পরসু দিন আমি একা যে পথে গুহায় পৌঁছেছিলাম , সেই পথেই আমরা আস্তে আস্তে এগোতে থাকলাম । দেখলাম আগের তুলনায় এবারে সময় যেন একটু বেশি লাগল । বারোটার দিকে আমরা সবাই গুহার মুখে পৌঁছালাম ।

         প্রতিবারের মতো এবারও শুভঙ্কর সঙ্গে থাকায় ওকেই টিম লিডার করা হয় । ওকে সাহায্য করার জন্য আমরা প্রত্যেকেই তো রইলাম । তা শুভঙ্কর জানালো এখানে একঘণ্টা রেস্ট নেওয়ার পর আমরা গুহায় প্রবেশ করবো । যদিও গুহার ভিতরে উঁকি মারা প্রায় সবারই হয়ে গেছে । আধঘণ্টা পরেই দেখি সবাই সেই বড়ো পাথরটার সামনে জড়ো হয়েছে । আসলে সামনে কি আছে তা জানার জন্য প্রত্যেকেই এতোটা উদগ্রীব যে , কারোরই যেন তর সইছে না ।

       আজ অনেক গুলি টর্চের আলো পড়ায় দেখলাম পাথরটার উপরে ডানদিকের কোনে যে খাঁজটা দেখেছিলাম , একটু চেষ্টা করলে সেখান দিয়ে একজন মানুষ গলে যেতে পারে । কিন্তু খাঁজটা উপরের দিকে হওয়ায় একটু অসুবিধা হতে পারে । তাই গাঁইতি ব্যবহার করে পাথরের ডানপাশটায় একটা মানুষের যাওয়ার মতো পথ করে নিতে হয় । সামনের পাথরটাকে ভেঙে পথ বের করতে বেশ খানিকক্ষণ সময় লেগে গেল । 

        শেষে যখন আলো পাথরের পিছনে গিয়ে পড়লো , তখন দেখলাম গুহাটা চওড়ায় কোথাও কুড়ি ফুট , তো কোথাও পঞ্চাশ ফুট । কিন্তু উচ্চতায় প্রায় সব জায়গাই ফুট কুড়ি মতো । তবে এখানেও উপরের ছাদ থেকে পাথরের ফলার মতো অংশ ঝুলে রয়েছে । আর দুপাশের দেওয়াল অদ্ভুত রকমের মসৃণ । 

Monday, 7 March 2016

রত্ন গুহা , 1

        এই একটি নেশার জন্য আবারও বিট্টুকে বিপদে পড়তে হচ্ছিল । না না , তেমন কিছু নয় , ছবি তোলার নেশাই বিট্টুকে বারবার বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণে উৎসাহিত করে । তো একবার হয়েছে কি , নেপালে বেড়াতে গিয়ে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে একটা পাহাড়ী গুহা দেখে আর লোভ সামলাতে পারেনি । ফলে দলছুট হতে সময় লাগেনি । যাদের সাথে এসেছিল তাদের বলে দিল সন্ধ্যায় হোটেলে দেখা হবে ।

       কিন্তু এই পাহাড়ী পথে একেবারে একা । তার উপর কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই নতুন উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া । সম্বল বলতে কাঁধের বিশেষ ব্যাগ , যেটা বিট্টুর সঙ্গে সবসময়ই থাকে । একটা আধভর্তি জলের বোতল , ক্যামেরা , মোবাইল । দেখে তো মনে হয় কিলোমিটার দুয়েক হবে । কিন্তু মাঝে যে খাদ রয়েছে । এইদিকের পাহাড় থেকে নেমে খাদের উল্টোদিকের পাহাড়ে উঠতে হবে । কতোটা নামতে হবে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না । কিন্তু ঘড়িতে সবে আটটা বাজে । প্রায় সারা দিনটাই পড়ে আছে । যদি ঘন্টা চারেকে ঐ দিকটা ঘুরে আসা যায় তো মনে হয় না খুব একটা অসুবিধা হবে ।

      যাই হোক নতুন উদ্দ্যোমে শুরু করা । প্রথমে কোন পথ ধরা হবে মোটামুটি একটা ঠিক করে নিয়ে দূরের কিছু একটাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে যাওয়া । এগিয়ে যাওয়া না বলে এখানে নীচে নামা বলাই ভালো । নামার সময় খুব একটা যে অসুবিধা হচ্ছে তাও না । শুধু একটু সতর্ক থাকা । পায়ের তলার পাথর খুব একটা আলগা নয় । আর পাথরের ফাঁকে ফাঁকে প্রচুর ঝোপঝাড় থাকায় আরও সুবিধা হচ্ছে । নামতে নামতে বিট্টু যে কতগুলি ছবি তুলল তা বলে বোঝানো যাবে না । বলা ভালো বিট্টু নীচে না নেমে ছবি তুলতেই ব্যস্ত ।

       প্রায় আধঘণ্টা পরে ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে বিট্টু আস্তে আস্তে ক্যামেরাটাকে ব্যাগে ঢোকালো । জলের বোতল থেকে ঠিক একঢক জল মুখে নিল । কিন্তু ঘিটলো না । সামনের অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য শুধু খালি চোখে কিছুক্ষণ উপভোগ করল । আর তারপরই প্রায় তিরিশ ফুট খাড়াই পাহাড় থেকে নামার উপায় খুঁজতে লাগল । তবে খুব বেশিক্ষণ খুঁজতে হল না । নীচ থেকে অনেক গাছ খাড়া হয়ে উঠে গেছে । তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটা আবার হাতের নাগালের মধ্যেই আছে । নীচে প্রায় পঞ্চাশ ফুট মতো সমতল ভূমি । তার পাশ দিয়ে একটা নদী বয়ে চলেছে । খুবই সরু নদী । কিন্তু তার স্রোত খুব । যাই হোক হাতের কয়েকটা জায়গায় ছড়ে যাওয়ার বিনিময়ে বিট্টু গাছ বেয়ে নীচে নেমেও এসেছে ।

       সমতল ভূমিতে পা দেওয়া মাত্রই বিট্টু কেমন যেন একটা নরম নরম ভাব অনুভব করছে । কোথাও বালির উপর একটা শতরঞ্জি পেতে দিলে যেরকম হয় অনেকটা তেমনই । কিন্তু এই শক্ত পাথুরে জমির মাঝে এইরকম নরম ভাব বিট্টুকে কেমন যেন মোহমুগ্ধ করে ফেলল। আর বিট্টুও পা ছড়িয়ে নীচে বসে পড়ল । আর বসেই ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করল ।

        খানিকক্ষণ বসার পর উঠে পড়ল । কারণ গুহাটির কাছে পৌঁছাতে গেলে এখনও অনেকটা উপরে উঠতে হবে । তবে এই দিক থেকে দেখে ওঠাটি খুব কঠিন হবে বলে মনে হচ্ছে না । মাঝে শুধু একটি খরস্রোতা । তবে নদীর জলের ফাঁকে ফাঁকে অনেক পাথর আছে দেখা যাচ্ছে । নদীর জল কাচের মতো স্বচ্ছ । আর গভীরতাও বেশি নয় । তবে আগের অভিজ্ঞতা থেকে বিট্টু জানে এইরকম নদীতে হঠাৎ নেমে পড়লে কি হতে পারে । তাই এখন বিট্টু খুব সতর্ক । আগে চারদিকটা ভালো করে দেখে নেয় । ঐ তো , একটু এগিয়ে গেলেই বেশ কয়েকটা পাথর নদীর মাঝ থেকে মাথা উঁচু করে জেগে রয়েছে ।

       পাথরগুলোর দিকে এগিয়ে যায় বিট্টু । এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছে কিছুটা দূরে তিনটি পাথর জল থেকে মাথা তুলে আছে । আর একটু এগিয়ে গেলেই নদীটা একটা পাথরের আড়ালে চলে গেছে । নদীর পাশ দিয়ে হাঁটার সময় একটা আলাদা রকমের সুন্দর অনুভুতি জাগে বিট্টুর মনে । শুধু নদীর কলকল শব্দ । যা এই পাহাড়ী নিস্তব্ধতাকে সজীবতায় পরিনত করেছে । কিন্তু পায়ের নীচের নরম পাথর বিট্টুর মনে এখনও প্রশ্ন রেখে দিয়ে যায় ।

       নীচের পাথরটার কিছু নমুনা নেওয়ার জন্য ঝুঁকে পড়ে । পায়ের নীচে অদ্ভুত রকমের একপ্রকার কালচে সবুজ রঙের বালি । আর বালিগুলি যেন অদৃশ্য এক টানে একে অপরকে আঁকড়ে রয়েছে । প্রচুর রোয়ার মতো খুব লম্বা লম্বা সুতো যেন একসাথে আটকে রয়েছে । প্রকৃতির কি অদ্ভুত বিস্ময় । কিছুটা সুতোর মতো অংশ ও কিছুটা বালি একটা খালি কৌটোর মধ্যে নিয়ে ব্যাগে রাখে বিট্টু । না ! নিজের চোখের প্রশংসা করতেই হয় বিট্টুকে । যার জন্য এই ঠান্ডা নদীর জলে একটুও পা না ঠেকিয়ে লাফিয়ে লাফিয়েই নদী পেরোতে পারলো ।

       নদী পেরিয়ে যাওয়ার পরও আবার বিস্ময় । যে পাথর তিনটের উপর দিয়ে লাফিয়ে বিট্টু নদী পেরোলো , সেই পাথরগুলি কেমন যেন আলগা মতো । শেষের পাথরটা তো এতটাই নড়ে উঠল যে বিট্টু প্রায় জলের মধ্যে পড়েই যাচ্ছিল । কোনোমতে সামলে নিয়েছে । এবারে উপরে ওঠার পালা । ওঠার আগে একবার ঘড়ি দেখে নেয় বিট্টু । সবে নটা পাঁচ ।

       আস্তে আস্তে উপরে উঠতে থাকে । মাঝে মাঝেই থেমে হাত ও পা কে বিশ্রাম দিয়ে নেওয়া । আর বিশ্রাম নেওয়ার সময় অপর দিকের সৌন্দর্য চোখ ভরে দেখা । তবে এই সৌন্দর্যের একটা আলাদা মাদকতা আছে । যা বিট্টুকে কখনও টায়ার্ড হতে দেয় না । তারপর আবার উপরে ওঠা । মাঝে একবারই শুধু একটা নীলচে বেগুনী রঙের ফুল দেখে ক্যামেরা বের করতে হয়েছিল ।

       ঘড়িতে তখন দশটা বেজে পনেরো । আর ফুট কুড়ি সামনেই একটা প্রাকৃতিক গুহা । একটু জিড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করছিল । গুহার সামনে বসে নীচের নদী আর সামনের পাহাড়ের অপূর্ব সৌন্দর্য দেখে চোখের পাতাও ফেলতে ইচ্ছে করছিল না । ব্যাগটা খুলে জলের বোতল বের করে বিট্টু । একটা বিস্কুটের প্যাকেট কেটে কয়েকটা বিস্কুটও খেয়ে নেয় । ব্যাগ থেকে টর্চটা বের করে আনে । একটা ছোট পাথর গুহার মুখ থেকে ভিতরের দিকে ছুঁড়ে দেয় । গুহার ভিতরের অন্ধকারে পাথরটির পড়ার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায় ।

     না এবারে তাড়াতাড়ি গুহার ভিতরটা ঘুরে দেখে নিতে হবে । ডানহাতে টর্চটি জ্বেলে ধরে আস্তে আস্তে গুহার ভিতরে প্রবেশ করে । গুহার মুখটা পনেরো ফুটের মতো হবে । ভিতরে মনে হয় একটু বেশিই হবে । উপরের ছাদ থেকে অনেক শক্ত পাথরের ফলার মতো অংশ নীচের দিকে ঝুলে রয়েছে । চারদিক দেখতে দেখতে ভিতরের দিকে ঢুকতে থাকি । মনে হয় খুব সামান্য ঢালু হয়ে গুহাটি ভিতরের দিকে চলেছে । সামনেই একটা বড় পাথর প্রায় সমস্ত অংশ জুড়ে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।

      তবে কি গুহার শেষ এখানেই ? হয় তো হবে । তবুও চারদিকে আলো ফেলে দেখতে থাকি । হঠাৎ দেওয়ালে কিসের যেন নকশা দেখতে পাই । হাঁ , দেওয়ালে আলো পড়তেই বোঝা যায় দেওয়ালের মধ্যে নানা রকমের ছবি ও কি সব হিজিবিজি লেখা রয়েছে । কি এসব ? বুঝতে না পারলেও ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করতে দেরি হয়নি । প্রায় আধঘণ্টা মতো লাগলো পুরোটা ঘুরে দেখতে ।

      আরও কিছুটা সময় এখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিই । আবারও একবার পুরো গুহাটা তন্ন তন্ন করে খোঁজা শুরু করি । কিছু দেখা বাদ যাচ্ছে না তো ? গুহার ভিতরটায় কেমন যেন একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা । শুধু দূর থেকে ভেসে আসা জলের কলকল শব্দ । কিন্তু কি অদ্ভুত । গুহার মুখের কাছে নদীর জলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল না । কিন্তু গুহার ভিতরে একেবারে শেষ প্রান্তে এসে বাইরের নদীর জলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে ।

       তবে কি এখানে কোনো ভূগর্ভস্থ নদী রয়েছে ? কিন্তু গুহাটির শেষ দেখতে পাচ্ছি তো । হয়তো গুহার ভিতরে পাথরের দেওয়ালের বিপরীতে কোনো নদী রয়েছে । আর তার থেকে শব্দ পাথর দ্বারা বাহিত হয়ে এই গুহার মধ্যে এসে পৌঁছাচ্ছে । সব দেখা শেষ করে এবারে গুহা থেকে বেরিয়ে পরব ভাবছি ।

       হঠাৎ গুহার মধ্যে যে পাথরটা পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল তার উপরে ডানদিকের কোনের কাছে একটা ছোট খাঁজ মতো চোখে পড়ল । তবে কি কেউ বা কারা এই বড় পাথরটা দিয়ে গুহাটির পথ আটকে রেখেছে ? কিন্তু কার পক্ষেই বা সম্ভব ? এতবড় একটা পাথরকে সরানো তো আর মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় । আমার কাছে তো পাথর ভাঙার মতো কোনো কিছুও নেই । কিন্তু কেমন যেন মনে হচ্ছে এই পাথরের  পিছনেও কিছু আছে ।

        যাই হোক , আজ আর তো কোনো কিছু সম্ভব নয় । কাল না হয় আর একবার আসা যাবে । আজ বরং ফেরা যাক । অনেকখানি হাঁটতে হবে । নামার সময় তো আর কষ্ট হয় না । কিন্তু ওঠা যে নামার মতো সহজে হয় না । ঠিক যেভাবে যেপথে গুহার মুখ পর্যন্ত এসেছিলাম , সেই পথেই হোটেলের দিকে ফিরে চললাম ।