Monday, 7 March 2016

রত্ন গুহা , 1

        এই একটি নেশার জন্য আবারও বিট্টুকে বিপদে পড়তে হচ্ছিল । না না , তেমন কিছু নয় , ছবি তোলার নেশাই বিট্টুকে বারবার বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণে উৎসাহিত করে । তো একবার হয়েছে কি , নেপালে বেড়াতে গিয়ে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে একটা পাহাড়ী গুহা দেখে আর লোভ সামলাতে পারেনি । ফলে দলছুট হতে সময় লাগেনি । যাদের সাথে এসেছিল তাদের বলে দিল সন্ধ্যায় হোটেলে দেখা হবে ।

       কিন্তু এই পাহাড়ী পথে একেবারে একা । তার উপর কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই নতুন উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া । সম্বল বলতে কাঁধের বিশেষ ব্যাগ , যেটা বিট্টুর সঙ্গে সবসময়ই থাকে । একটা আধভর্তি জলের বোতল , ক্যামেরা , মোবাইল । দেখে তো মনে হয় কিলোমিটার দুয়েক হবে । কিন্তু মাঝে যে খাদ রয়েছে । এইদিকের পাহাড় থেকে নেমে খাদের উল্টোদিকের পাহাড়ে উঠতে হবে । কতোটা নামতে হবে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না । কিন্তু ঘড়িতে সবে আটটা বাজে । প্রায় সারা দিনটাই পড়ে আছে । যদি ঘন্টা চারেকে ঐ দিকটা ঘুরে আসা যায় তো মনে হয় না খুব একটা অসুবিধা হবে ।

      যাই হোক নতুন উদ্দ্যোমে শুরু করা । প্রথমে কোন পথ ধরা হবে মোটামুটি একটা ঠিক করে নিয়ে দূরের কিছু একটাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে যাওয়া । এগিয়ে যাওয়া না বলে এখানে নীচে নামা বলাই ভালো । নামার সময় খুব একটা যে অসুবিধা হচ্ছে তাও না । শুধু একটু সতর্ক থাকা । পায়ের তলার পাথর খুব একটা আলগা নয় । আর পাথরের ফাঁকে ফাঁকে প্রচুর ঝোপঝাড় থাকায় আরও সুবিধা হচ্ছে । নামতে নামতে বিট্টু যে কতগুলি ছবি তুলল তা বলে বোঝানো যাবে না । বলা ভালো বিট্টু নীচে না নেমে ছবি তুলতেই ব্যস্ত ।

       প্রায় আধঘণ্টা পরে ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে বিট্টু আস্তে আস্তে ক্যামেরাটাকে ব্যাগে ঢোকালো । জলের বোতল থেকে ঠিক একঢক জল মুখে নিল । কিন্তু ঘিটলো না । সামনের অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য শুধু খালি চোখে কিছুক্ষণ উপভোগ করল । আর তারপরই প্রায় তিরিশ ফুট খাড়াই পাহাড় থেকে নামার উপায় খুঁজতে লাগল । তবে খুব বেশিক্ষণ খুঁজতে হল না । নীচ থেকে অনেক গাছ খাড়া হয়ে উঠে গেছে । তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটা আবার হাতের নাগালের মধ্যেই আছে । নীচে প্রায় পঞ্চাশ ফুট মতো সমতল ভূমি । তার পাশ দিয়ে একটা নদী বয়ে চলেছে । খুবই সরু নদী । কিন্তু তার স্রোত খুব । যাই হোক হাতের কয়েকটা জায়গায় ছড়ে যাওয়ার বিনিময়ে বিট্টু গাছ বেয়ে নীচে নেমেও এসেছে ।

       সমতল ভূমিতে পা দেওয়া মাত্রই বিট্টু কেমন যেন একটা নরম নরম ভাব অনুভব করছে । কোথাও বালির উপর একটা শতরঞ্জি পেতে দিলে যেরকম হয় অনেকটা তেমনই । কিন্তু এই শক্ত পাথুরে জমির মাঝে এইরকম নরম ভাব বিট্টুকে কেমন যেন মোহমুগ্ধ করে ফেলল। আর বিট্টুও পা ছড়িয়ে নীচে বসে পড়ল । আর বসেই ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করল ।

        খানিকক্ষণ বসার পর উঠে পড়ল । কারণ গুহাটির কাছে পৌঁছাতে গেলে এখনও অনেকটা উপরে উঠতে হবে । তবে এই দিক থেকে দেখে ওঠাটি খুব কঠিন হবে বলে মনে হচ্ছে না । মাঝে শুধু একটি খরস্রোতা । তবে নদীর জলের ফাঁকে ফাঁকে অনেক পাথর আছে দেখা যাচ্ছে । নদীর জল কাচের মতো স্বচ্ছ । আর গভীরতাও বেশি নয় । তবে আগের অভিজ্ঞতা থেকে বিট্টু জানে এইরকম নদীতে হঠাৎ নেমে পড়লে কি হতে পারে । তাই এখন বিট্টু খুব সতর্ক । আগে চারদিকটা ভালো করে দেখে নেয় । ঐ তো , একটু এগিয়ে গেলেই বেশ কয়েকটা পাথর নদীর মাঝ থেকে মাথা উঁচু করে জেগে রয়েছে ।

       পাথরগুলোর দিকে এগিয়ে যায় বিট্টু । এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছে কিছুটা দূরে তিনটি পাথর জল থেকে মাথা তুলে আছে । আর একটু এগিয়ে গেলেই নদীটা একটা পাথরের আড়ালে চলে গেছে । নদীর পাশ দিয়ে হাঁটার সময় একটা আলাদা রকমের সুন্দর অনুভুতি জাগে বিট্টুর মনে । শুধু নদীর কলকল শব্দ । যা এই পাহাড়ী নিস্তব্ধতাকে সজীবতায় পরিনত করেছে । কিন্তু পায়ের নীচের নরম পাথর বিট্টুর মনে এখনও প্রশ্ন রেখে দিয়ে যায় ।

       নীচের পাথরটার কিছু নমুনা নেওয়ার জন্য ঝুঁকে পড়ে । পায়ের নীচে অদ্ভুত রকমের একপ্রকার কালচে সবুজ রঙের বালি । আর বালিগুলি যেন অদৃশ্য এক টানে একে অপরকে আঁকড়ে রয়েছে । প্রচুর রোয়ার মতো খুব লম্বা লম্বা সুতো যেন একসাথে আটকে রয়েছে । প্রকৃতির কি অদ্ভুত বিস্ময় । কিছুটা সুতোর মতো অংশ ও কিছুটা বালি একটা খালি কৌটোর মধ্যে নিয়ে ব্যাগে রাখে বিট্টু । না ! নিজের চোখের প্রশংসা করতেই হয় বিট্টুকে । যার জন্য এই ঠান্ডা নদীর জলে একটুও পা না ঠেকিয়ে লাফিয়ে লাফিয়েই নদী পেরোতে পারলো ।

       নদী পেরিয়ে যাওয়ার পরও আবার বিস্ময় । যে পাথর তিনটের উপর দিয়ে লাফিয়ে বিট্টু নদী পেরোলো , সেই পাথরগুলি কেমন যেন আলগা মতো । শেষের পাথরটা তো এতটাই নড়ে উঠল যে বিট্টু প্রায় জলের মধ্যে পড়েই যাচ্ছিল । কোনোমতে সামলে নিয়েছে । এবারে উপরে ওঠার পালা । ওঠার আগে একবার ঘড়ি দেখে নেয় বিট্টু । সবে নটা পাঁচ ।

       আস্তে আস্তে উপরে উঠতে থাকে । মাঝে মাঝেই থেমে হাত ও পা কে বিশ্রাম দিয়ে নেওয়া । আর বিশ্রাম নেওয়ার সময় অপর দিকের সৌন্দর্য চোখ ভরে দেখা । তবে এই সৌন্দর্যের একটা আলাদা মাদকতা আছে । যা বিট্টুকে কখনও টায়ার্ড হতে দেয় না । তারপর আবার উপরে ওঠা । মাঝে একবারই শুধু একটা নীলচে বেগুনী রঙের ফুল দেখে ক্যামেরা বের করতে হয়েছিল ।

       ঘড়িতে তখন দশটা বেজে পনেরো । আর ফুট কুড়ি সামনেই একটা প্রাকৃতিক গুহা । একটু জিড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করছিল । গুহার সামনে বসে নীচের নদী আর সামনের পাহাড়ের অপূর্ব সৌন্দর্য দেখে চোখের পাতাও ফেলতে ইচ্ছে করছিল না । ব্যাগটা খুলে জলের বোতল বের করে বিট্টু । একটা বিস্কুটের প্যাকেট কেটে কয়েকটা বিস্কুটও খেয়ে নেয় । ব্যাগ থেকে টর্চটা বের করে আনে । একটা ছোট পাথর গুহার মুখ থেকে ভিতরের দিকে ছুঁড়ে দেয় । গুহার ভিতরের অন্ধকারে পাথরটির পড়ার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায় ।

     না এবারে তাড়াতাড়ি গুহার ভিতরটা ঘুরে দেখে নিতে হবে । ডানহাতে টর্চটি জ্বেলে ধরে আস্তে আস্তে গুহার ভিতরে প্রবেশ করে । গুহার মুখটা পনেরো ফুটের মতো হবে । ভিতরে মনে হয় একটু বেশিই হবে । উপরের ছাদ থেকে অনেক শক্ত পাথরের ফলার মতো অংশ নীচের দিকে ঝুলে রয়েছে । চারদিক দেখতে দেখতে ভিতরের দিকে ঢুকতে থাকি । মনে হয় খুব সামান্য ঢালু হয়ে গুহাটি ভিতরের দিকে চলেছে । সামনেই একটা বড় পাথর প্রায় সমস্ত অংশ জুড়ে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।

      তবে কি গুহার শেষ এখানেই ? হয় তো হবে । তবুও চারদিকে আলো ফেলে দেখতে থাকি । হঠাৎ দেওয়ালে কিসের যেন নকশা দেখতে পাই । হাঁ , দেওয়ালে আলো পড়তেই বোঝা যায় দেওয়ালের মধ্যে নানা রকমের ছবি ও কি সব হিজিবিজি লেখা রয়েছে । কি এসব ? বুঝতে না পারলেও ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করতে দেরি হয়নি । প্রায় আধঘণ্টা মতো লাগলো পুরোটা ঘুরে দেখতে ।

      আরও কিছুটা সময় এখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিই । আবারও একবার পুরো গুহাটা তন্ন তন্ন করে খোঁজা শুরু করি । কিছু দেখা বাদ যাচ্ছে না তো ? গুহার ভিতরটায় কেমন যেন একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা । শুধু দূর থেকে ভেসে আসা জলের কলকল শব্দ । কিন্তু কি অদ্ভুত । গুহার মুখের কাছে নদীর জলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল না । কিন্তু গুহার ভিতরে একেবারে শেষ প্রান্তে এসে বাইরের নদীর জলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে ।

       তবে কি এখানে কোনো ভূগর্ভস্থ নদী রয়েছে ? কিন্তু গুহাটির শেষ দেখতে পাচ্ছি তো । হয়তো গুহার ভিতরে পাথরের দেওয়ালের বিপরীতে কোনো নদী রয়েছে । আর তার থেকে শব্দ পাথর দ্বারা বাহিত হয়ে এই গুহার মধ্যে এসে পৌঁছাচ্ছে । সব দেখা শেষ করে এবারে গুহা থেকে বেরিয়ে পরব ভাবছি ।

       হঠাৎ গুহার মধ্যে যে পাথরটা পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল তার উপরে ডানদিকের কোনের কাছে একটা ছোট খাঁজ মতো চোখে পড়ল । তবে কি কেউ বা কারা এই বড় পাথরটা দিয়ে গুহাটির পথ আটকে রেখেছে ? কিন্তু কার পক্ষেই বা সম্ভব ? এতবড় একটা পাথরকে সরানো তো আর মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় । আমার কাছে তো পাথর ভাঙার মতো কোনো কিছুও নেই । কিন্তু কেমন যেন মনে হচ্ছে এই পাথরের  পিছনেও কিছু আছে ।

        যাই হোক , আজ আর তো কোনো কিছু সম্ভব নয় । কাল না হয় আর একবার আসা যাবে । আজ বরং ফেরা যাক । অনেকখানি হাঁটতে হবে । নামার সময় তো আর কষ্ট হয় না । কিন্তু ওঠা যে নামার মতো সহজে হয় না । ঠিক যেভাবে যেপথে গুহার মুখ পর্যন্ত এসেছিলাম , সেই পথেই হোটেলের দিকে ফিরে চললাম ।

No comments:

Post a Comment